সাইবেরিয়ার মাটি গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। সাধারণভাবে মাটি শুকিয়ে গেলে মিথেন নিঃসরণ কমার কথা। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটাই ঘটছে। বিশ্বের উত্তরাঞ্চলের পারমাফ্রস্ট এলাকাগুলোর মধ্যে পূর্ব সাইবেরিয়াতেই মিথেন নিঃসরণ সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে গোটা সাইবেরিয়া থেকে নিঃসৃত মিথেনের পরিমাণ ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি। ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সাইবেরিয়ায় মিথেন নিঃসরণ গড়ে বছরে প্রায় ৫ শতাংশ করে বেড়েছে। বেইজিংয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাটমসফেরিক ফিজিক্স-এর ইয়ি লিউ, এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পল পামার এবং বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা উপগ্রহ,মাটির কাছাকাছি স্থাপিত যন্ত্র, বিমান ও অন্যান্য উৎসের তথ্য মিলিয়ে এই পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন। সাইবেরিয়াকে ইয়েনিসেই নদী মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করেছে। নদীর পশ্চিমে মাটি আরও ভিজে হচ্ছে, আর পূর্বে মাটি আরও শুকিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দু-ক্ষেত্রেই মিথেন বাড়ছে, যদিও কারণ আলাদা। পশ্চিম সাইবেরিয়ায় শীতের শেষ দিকে উষ্ণ ও আর্দ্র আটলান্টিক বায়ু ঢুকে পড়ছে। ফেব্রুয়ারিতে তাপমাত্রা বাড়লে তুষার দ্রুত গলে যায়। সাদা তুষার সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে, কিন্তু বরফ সরে গেলে খোলা মাটি বেশি তাপ শোষণ করে। ফলে মাটি আরও উষ্ণ হয় এবং গ্রীষ্মে বেশি গভীর পর্যন্ত জমাট মাটি গলে যায়। জলসমৃদ্ধ, কম-অক্সিজেন মাটিতে থাকা অণুজীব তখন জৈব পদার্থ ভেঙে মিথেন উৎপন্ন করে। ২০২০ সালে পশ্চিম সাইবেরিয়ায় শীতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এরপর বসন্তে বেশি সূর্যালোক ও উষ্ণ-আর্দ্র মাটির কারণে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত মিথেন নিঃসরণ স্বাভাবিকের তুলনায় ৮৫ শতাংশ বেশি হয়। তবে পূর্ব সাইবেরিয়ার কাহিনী ভিন্ন। সেখানে উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। বাষ্পীভবন কম হওয়ায় মাটি আরও গরম হয়ে ওঠে। শুকিয়ে যাওয়া গাছপালা ও ঝোপঝাড়ে সহজেই আগুন ধরে। বজ্রপাতও এই দাবানল বাড়িয়ে দেয়। ২০১৯ সালে পূর্ব সাইবেরিয়ায় রেকর্ড মাত্রার উষ্ণ গ্রীষ্মে বিপুল পরিমাণ শুকনো গাছ পুড়ে যায় এবং মিথেন নিঃসরণ প্রায় দ্বিগুণ হয়। তবে ২০২৩ সালে আগুন খানিকটা কম হলেও মিথেনের মাত্রা আগের তুলনায় বেশি ছিল। গবেষকদের ধারণা, আগুনে পোড়া মাটি পরের বছরগুলোতেও গভীর স্তর পর্যন্ত গলতে থাকায় এর প্রভাব থেকে যেতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সাইবেরিয়ার তাপমাত্রা ২০১০–২০২৩ সালের গড়ের তুলনায় ১.৯ থেকে ২.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। সেই উষ্ণতার সঙ্গে বর্তমান মিথেন-নিঃসরণের সম্পর্ক বজায় থাকলে বছরে আরও ১ কোটি ৪০ লাখ থেকে ২ কোটি ৮০ লাখ টন মিথেন বায়ুমণ্ডলে যুক্ত হতে পারে। মিথেন শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। তাই উষ্ণতা বাড়লে যদি মিথেন নিঃসরণ বাড়ে, আর সেই মিথেন আবার উষ্ণতা আরও বাড়ায়, তাহলে তৈরি হতে পারে একটি দুষ্টচক্র বা ‘ফিডব্যাক লুপ’। তবে এই সম্ভাবনার পুরো চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। সাইবেরিয়ায় মাটির পরিমাপক কেন্দ্র অপ্রতুল, আর শীতের অন্ধকারে উপগ্রহের পর্যবেক্ষণও সীমিত। ফলে এই বিশাল অঞ্চলে মিথেনের উৎস ও পরিবর্তন সম্পর্কে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। অর্থাৎ, সাইবেরিয়ার কাহিনী শুধু পারমাফ্রস্ট গলার নয়। কোথাও অতিরিক্ত জল, কোথাও অতিরিক্ত শুষ্কতা, আর দুই ক্ষেত্রেই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মিথেনের ঝুঁকি।
সূত্র: Decadal doubling of Siberian methane emissions due to warming-induced fires and methanogenesis- Science ; Earth . com; August 2026
