পোকামাকড়ের ব্যথাবোধ

পোকামাকড়ের ব্যথাবোধ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জুন, ২০২৬

পোকামাকড় কি আমাদের মতন ব্যথা অনুভব করতে পারে? সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ঝিঁঝিঁ পোকা তার আঘাতপ্রাপ্ত অ্যান্টেনা বা শুঁড়কে বারবার স্পর্শ করছে, পরিষ্কার করছে এবং যত্ন নিচ্ছে- ঠিক যেমন একটি কুকুর তার জখম পা রক্ষা করার চেষ্টায় চাটে । বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল স্বাভাবিক স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া নয়, এ হল ব্যথা অনুভবের সম্ভাব্য ইঙ্গিত। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ টমাস হোয়াইট বলেন, “ব্যথা কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়। এ এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তিকর অনুভূতি, যা প্রাণীকে আঘাতপ্রাপ্ত অংশের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে বাধ্য করে”। মানুষ বা অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যথা চিহ্নিত করা তুলনামূলক সহজ। একটি কুকুর যদি খুঁড়িয়ে হাঁটে বা বারবার একটি নির্দিষ্ট জায়গা চাটে, আমরা সহজেই ধরে নিই সে ব্যথা পাচ্ছে। কিন্তু পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে বিষয়টা এত সহজ নয়। তাই বিজ্ঞানীরা তাদের আচরণের মধ্যে ব্যথার ইঙ্গিত খোঁজার চেষ্টা করেন। বিশেষ করে তারা দেখেন, কোনো প্রাণী আঘাতপ্রাপ্ত অংশকে দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষা বা পরিচর্যা করছে কিনা। এই ধারণা পরীক্ষা করতে গবেষকরা কয়েক ডজন ঝিঁঝিঁ পোকার উপর পরীক্ষা চালান। তাদের তিনটি দলে ভাগ করা হয়। প্রথম দলের একটি অ্যান্টেনায় ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার গরম ঝালাইয়ের আয়রন স্পর্শ করানো হয়। দ্বিতীয় দলকে একই যন্ত্র স্পর্শ করানো হয়, কিন্তু সেটি গরম ছিল না। তৃতীয় দলটি ছিল নিয়ন্ত্রিত, যাদের উপর কোনো পরীক্ষা করা হয়নি। ৬৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা যথেষ্ট অস্বস্তিকর হলেও তা স্থায়ী ক্ষতি করার মতো নয়। তবে যেসব ঝিঁঝি পোকার অ্যান্টেনায় গরম প্রোব লাগানো হয়, তারা বারবার সেই নির্দিষ্ট অ্যান্টেনাটি পরিষ্কার করতে থাকে এবং দীর্ঘ সময় ধরে সেটির প্রতি মনোযোগ দেয়। অন্যদিকে যেসব পোকা গরম স্পর্শ পায়নি, তারা সামান্য বিচলিত হলেও খুব দ্রুত স্বাভাবিক আচরণে ফিরে যায়। হোয়াইটের মতে, “যদি একই ধরনের আচরণ আমরা কোনো পোষা প্রাণীর মধ্যে দেখতাম, তাহলে সেটিকে নিঃসন্দেহে ব্যথার লক্ষণ বলেই ধরে নিতাম। কিন্তু পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করি, কারণ তারা মানুষের মতো দেখতে নয় বা আচরণ করে না”। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিজ্ঞানীরা পোকামাকড়ের মস্তিষ্ক, আচরণ এবং অনুভূতি সম্পর্কে অনেক নতুন তথ্য জানতে পেরেছেন। যেমন, মৌমাছি রঙিন কাঠের বল গড়িয়ে এক ধরনের খেলাধুলার মতন আচরণ করে । আবার মানসিক চাপের মধ্যে থাকা মৌমাছিরা নৈরাশ্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়াও দেখায়। প্রাণীচেতনা নিয়ে তৈরি “নিউ ইয়র্ক ডিক্লারেশন অন অ্যানিমাল কনশাসনেস”-এ ৫০০-রও বেশি বিজ্ঞানী ও দার্শনিক স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের পাশাপাশি অনেক অমেরুদণ্ডী প্রাণী, এমনকি পোকামাকড়ের মধ্যেও সচেতন অভিজ্ঞতা থাকার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। পশু কল্যাণ আইনও ধীরে ধীরে এই ধারণার দিকে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে কিছু দেশে অক্টোপাস ও কাঁকড়ার মতো অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের সংবেদনশীল জীব হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পোকামাকড়ও সেই তালিকায় যুক্ত হতে পারে। খাদ্য, পশুখাদ্য ও গবেষণার জন্য প্রতিবছর লক্ষ কোটি ঝিঁঝিঁ পোকা খামারে পালন করা হয়। যদি তারা সত্যিই ব্যথা অনুভব করতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের জীবনযাত্রা ও কল্যাণের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

সূত্র: The Guardian, May, 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 + 12 =