লেজার আলোর সাহায্যে পরমাণুকে প্রায় পরম শূন্য তাপমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিলেন তিনি। তাঁর গবেষণাই খুলে দিয়েছিল কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার এক নতুন দিগন্ত। ৯৩ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন সেই ফরাসি পদার্থবিদ ও নোবেলজয়ী ক্লদ কোয়েন-তানুজি।
পরমাণুকে কতটা ঠান্ডা করা সম্ভব? তাপমাত্রার সর্বনিম্ন সীমা হল পরম শূন্য বা মাইনাস ২৭৩.১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সীমার কাছাকাছি পৌঁছনোর কঠিন প্রয়াসে একসময় বিজ্ঞানীদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল লেজার আলো। আর সেই গবেষণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন ফরাসি পদার্থবিদ ক্লদ কোয়েন-তানুজি। গত ২২ অক্টোবর প্যারিসে ৯৩ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন পদার্থবিদ্যার এই কিংবদন্তি।
১৯৯৭ সালে স্টিভেন চু ও উইলিয়াম ফিলিপসের সঙ্গে যৌথভাবে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। লেজার আলো ব্যবহার করে পরমাণুকে শীতল করা এবং নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখার পদ্ধতি আবিষ্কারের স্বীকৃতি হিসেবেই এসেছিল এই সম্মান। কিন্তু পরমাণুকে আলো দিয়ে ঠান্ডা করা যায় কীভাবে? বিষয়টি শুনতে কিছুটা অদ্ভুত। এর পিছনে রয়েছে আলোকণা বা ফোটনের সঙ্গে পরমাণুর সংঘর্ষের কৌশল। আশির দশকে স্টিভেন চু ও উইলিয়াম ফিলিপসের পরীক্ষায় দেখা যায়, লেজার আলোর ফোটন পরমাণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলে তার গতিশক্তি কমে যেতে পারে। ফলে পরমাণুর গ্যাসের তাপমাত্রাও নেমে আসে এক মিলিকেলভিনের অনেক নীচে।
প্রথমে বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করেছিলেন ‘ডপলার শীতলীকরণ’ তত্ত্ব দিয়ে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেল, এই পদ্ধতিতে যতটা ঠান্ডা হওয়ার কথা, পরমাণু তার চেয়েও অনেক কম তাপমাত্রায় পৌঁছে যাচ্ছে। অর্থাৎ, পরমাণুকে শীতল করার পিছনে কাজ করছে সূক্ষ্মতর কোনও প্রক্রিয়া। আর সেই রহস্যের সমাধানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন কোয়েন-তানুজি। তাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে তিনি দেখান, ডপলার শীতলীকরণের সীমা পেরিয়েও পরমাণুর তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। সেই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করেন আরও কার্যকর শীতলীকরণ পদ্ধতি। পরবর্তী সময়ে ভবিষ্যতের আর এক নোবেলজয়ী অ্যালাঁ আসপে এবং অন্য গবেষকদের সঙ্গে কাজ করে হিলিয়াম গ্যাসকে শীতলতর করতে সক্ষম হন তিনি । ১৯৯৫ সালে সেই তাপমাত্রা নেমে আসে মাত্র ১৮০ ন্যানোকেলভিনে। অর্থাৎ, পরম শূন্যের খুব কাছাকাছি।
১৯৩৩ সালের ১ এপ্রিল আলজেরিয়ার কনস্টান্টিন শহরে জন্ম কোয়েন-তানুজির। ১৯৫৩ সালে ফ্রান্সে চলে আসেন তিনি। প্যারিসের বিখ্যাত ইকোল নরমাল সুপিরিয়রে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৭ সালে স্নাতক হওয়ার পর আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণে সামরিক দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁকে। ১৯৬০ সালে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে শুরু করেন গবেষণা। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল আলোর সাহায্যে পরমাণুর শক্তিস্তর পরিবর্তনের পদ্ধতি, যাকে বলা হয় ‘অপটিক্যাল পাম্পিং’। এই গবেষণায় তাঁর পথপ্রদর্শক ছিলেন নোবেলজয়ী আলফ্রেড কাস্তলে এবং জ্যঁ ব্রসেল। পরে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন কোয়েন-তানুজি। তাঁর ছাত্রদের মধ্যেও ছিলেন একাধিক প্রতিভাবান বিজ্ঞানী। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সের্ঝ হারোশ, যিনি ২০১২ সালে কোয়ান্টাম ব্যবস্থার পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গবেষণার জন্য পদার্থবিদ্যায় নোবেল পান।
গবেষণার পাশাপাশি কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা শেখানোর ক্ষেত্রেও ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। বার্নার দিয়ু ও ফ্রাঁক লালোয়ের সঙ্গে লেখা তাঁর তিন খণ্ডের বই ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ আজও এই জটিল বিষয়টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যবই হিসেবে পরিচিত। লেজার দিয়ে পরমাণুকে ঠান্ডা করার গবেষণা শুধু তাপমাত্রার নতুন সীমা ছোঁয়ার কাহিনী নয়। এর হাত ধরেই খুলেছে কোয়ান্টাম জগতকে আরও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের নতুন সম্ভাবনা। আধুনিক পদার্থবিদ্যার সেই পথ নির্মাতাদের অন্যতম ছিলেন ক্লদ কোয়েন-তানুজি। তাঁর প্রয়াণে বিজ্ঞান হারাল এক অসামান্য পথপ্রদর্শককে।
সূত্র: Physics world, 28 October 2026.
