প্রয়াত হলেন এডা ইয়োনাথ 

প্রয়াত হলেন এডা ইয়োনাথ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গত ৩১ আগস্ট প্রখ্যাত ইসরায়েলি গাঠনিক জীববিজ্ঞানী ও এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফার এডা ইয়োনাথ ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। রাইবোজোমের গঠন ও কার্যপ্রণালী নিয়ে অগ্রণী গবেষণার জন্য ২০০৯ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গবেষণা, গবেষণাগার পরিচালনা এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা চালিয়ে গেছেন। অসম্ভব বলে মনে হওয়া বৈজ্ঞানিক প্রশ্নের পেছনে দীর্ঘদিন সাহসের সঙ্গে ছুটে চলার জন্য তিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ইয়োনাথের বাবা-মা ১৯৩৩ সালে পোল্যান্ড থেকে বর্তমান ইসরায়েলে চলে আসেন। ১৯৩৯ সালে জেরুজালেমে ইয়োনাথের জন্ম হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত কৌতূহলী ছিলেন। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাড়ির ছাদের উচ্চতা মাপতে গিয়ে টেবিল, চেয়ার ও টুল একটির ওপর আরেকটি সাজিয়ে বারান্দা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ভেঙেছিলেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন রাবাই ( ইহুদি ধর্মগুরু) ও মুদি দোকানের মালিক। ইয়োনাথ যখন মাত্র ১১ বছরের, তখন তাঁর বাবা মারা যান। ফলে তিনি ও তাঁর মা গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েন এবং আত্মীয়দের কাছে তেল আবিবে চলে যান। উচ্চবিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করার পর তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে দুই বছর বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা দান করেন। এরপর ১৯৬২ সালে জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক এবং ১৯৬৪ সালে জৈবরসায়ন বিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ভাইজম্যান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সে গবেষণা শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফিতে পিএইচ ডি করেন। যুক্তরাষ্ট্রে কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে পোস্টডক্টরাল গবেষণার পর ১৯৭০ সালে ইসরায়েলে ফিরে এসে দেশের প্রথম প্রোটিন ক্রিস্টালোগ্রাফি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৮ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের গঠনগত জীববিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান ছিলেন। একই সময়ে ১৯৮৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত জার্মান ইলেকট্রন সিনক্রোট্রন রেডিয়েশন ফেসিলিটিতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্ট্রাকচার অ্যান্ড ডাইনামিক্স অব ম্যাটার -এর নেতৃত্ব দেন। কর্মজীবনে তিনি ২০০টিরও বেশি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন এবং তাঁর গবেষণাপত্র প্রায় ১৬,০০০ বার উদ্ধৃত হয়েছে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি গবেষণা চালিয়ে যান এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয় ছিলেন।

ইয়োনাথের বৈজ্ঞানিক গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল রাইবোজোমের ত্রিমাত্রিক কাঠামো নির্ণয় করা। রাইবোজোমই কোষের সেই জটিল আণবিক যন্ত্র, যা জেনেটিক নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রোটিন তৈরি করে। একারণেই রাইবোজোমকে প্রোটিন তৈরির কারখানা বলা হয়। কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোমের আকার ও জটিলতার কারণে এর গঠন নির্ণয় একসময় প্অসম্ভব মনে হতো। একটি ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোমের আণবিক ভর প্রায় ২৩ লাখ ডাল্টন এবং এতে ৫০টিরও বেশি প্রোটিন ও দুটি দীর্ঘ RNA অণু রয়েছে। ফলে এর প্রতিটি পরমাণুর অবস্থান নির্ণয় করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। ফলত তৎকালীন অনেক বিজ্ঞানীই তাঁর পরিকল্পনাকে অসম্ভব বলে মনে করেছিলেন, এমনকি তাঁকে নিয়ে উপহাসও করেছিলেন।

অনেকের সংশয় ও তির্যক কথাবার্তা সত্ত্বেও ইয়োনাথ এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি ব্যবহার করে কয়েক দশক ধরে গবেষণা চালিয়ে যান। একটা সময় এল, যখন তিনি ও তাঁর সহ গবেষকরা রাইবোজোম কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে প্রোটিন তৈরি হয়, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের পরিচিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছিলেন । একই সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার রাইবোজোমে অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে কাজ করে এবং কীভাবে ওষুধ-প্রতিরোধ তৈরি হয়, সেসব বোঝার পথও সুগম হল । ফলত নতুন কোনো অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির গবেষণায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৯ সালে তিনি রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান। ৪৫ বছরের মধ্যে তিনিই প্রথম পুরস্কারজয়ী নারী তিনি ইসরায়েল রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক ও সাংস্কৃতিক সম্মাননা ইসরায়েল পুরস্কার, ইসরায়েলের ভলফ ফাউন্ডেশন প্রদত্ত আন্তর্জাতিক ভলফ পুরস্কার -সহ আরও বহু আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করেন। ২০১৭ সালে কলকাতার বোস ইনস্টিটিউট তাঁকে বিশেষ অতিথি হিসাবে সম্মান জানিয়েছিল।

কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয় -এর বায়োকেমিস্ট ও মলিকিউলার বায়োলজিস্ট ভ্যালেরি মিজরাহি ইয়োনাথকে তাঁর অন্যতম আদর্শ হিসেবে দেখতেন। তাঁর মতে, ইয়োনাথ ছিলেন এক সাহসী, মেধাবী ও অসাধারণ অধ্যবসায়ী বিজ্ঞানী। ২০১৮ সালে UNESCO-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইয়োনাথ বলেন, তাঁর কর্মজীবনে তিনি কখনও লিঙ্গবৈষম্যর চাপ অনুভব করেননি। তবে তাঁর মতে, সমাজ নারীদের বিজ্ঞানী হতে যথেষ্ট উৎসাহ দেয় না।

ইয়োনাথ তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্য বলেছিলেন, অন্যের পরামর্শের পেছনে না ছুটে নিজের কৌতূহল ও আগ্রহকে বাঁচিয়ে রেখে সেটাকেই অনুসরণ করতে। তাঁর মতে, বিজ্ঞানে সাহসের সঙ্গে কৌতূহলও অপরিহার্য। তিনি প্রকৃত অর্থে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন মনে অদম্য জেদ, সাহস ও কৌতূহলী মন থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

 

সূত্র: https://cen.acs.org/people/obituaries/ada-yonath-nobel-laureate-crystallographer-obituary/104/web/2026/09

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eight − 7 =