বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষিত চলনপথ 

বন্যপ্রাণীদের সুরক্ষিত চলনপথ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৩ জুন, ২০২৬

বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় ‘ওয়াইল্ডলাইফ করিডর’ বা বন্যপ্রাণী সংযোগপথ দীর্ঘদিন ধরেই একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে গণ্য। এগুলি এমন বিশেষ ভূখণ্ড, যা বিভিন্ন বনাঞ্চল বা সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে প্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ করে দেয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই চলনপথগুলিকে নিছক একবারই নির্ধারণ করে রেখে দিলে তা ভবিষ্যতে কার্যকারিতা হারাতে পারে। সাধারণত পরিকল্পনাকারীরা বর্তমানের উপযুক্ত আবাসস্থল চিহ্নিত করে চলনপথগুলি নির্ধারণ করেন। ধারণা করা হয়, ভবিষ্যতেও সেই এলাকাগুলি প্রাণীদের জন্য একই রকম উপযোগী থাকবে। কিন্তু গবেষকদের মতে, বাস্তবে পরিস্থিতি এতটা স্থির নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাণীদের উপযোগী আবাসস্থল ক্রমাগত স্থান বদলাচ্ছে। ফলে আজ যে পথ নিরাপদ বলে মনে হচ্ছে, কয়েক দশক পরে সেটি প্রাণীদের এমন জায়গায় নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তাদের টিকে থাকা কঠিন। চীনের উহানে অবস্থিত হুয়াঝং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ বো শু এবং তাঁর সহকর্মীরা এই বিষয়টি নিয়ে একটি গবেষণা করেছেন। তাঁরা এমন একটি কম্পিউটার মডেল তৈরি করেছেন, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর আবাসস্থলের মান ও প্রাণীদের চলাচলের সুবিধা-অসুবিধা নতুন করে মূল্যায়ন করে। চীনের মূল ভূখণ্ডে বসবাসকারী চারটি বিপন্ন জীবগোষ্ঠী—উভচর প্রাণী, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং উদ্ভিদ – নিয়ে ২১০০ সাল পর্যন্ত সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়। ফলাফল দেখাচ্ছে, উপযুক্ত আবাসস্থল স্থির থাকে না। পুরোনো আবাসস্থলের অনেকাংশ ধীরে ধীরে অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে, আবার নতুন উপযুক্ত অঞ্চল গড়ে ওঠে অনেক দূরে। এই পরিবর্তনও ধারাবাহিক নয়। কোথাও আবাসস্থল হারিয়ে যাচ্ছে, আবার অন্য কোথাও নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি এলাকা অল্প সময়ের জন্য উপযোগী থেকে পরে আবার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। প্রাণীদের চলাচলে দুটি বড় বাধা কাজ করে। প্রথমটি জলবায়ুজনিত। অতিরিক্ত তাপ, খরা বা অন্যান্য পরিবেশগত পরিবর্তন। দ্বিতীয়টি মানুষের কর্মকাণ্ড। যেমন শহর বিস্তার, কৃষিকাজ, রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণ।

যদি চলনপথ তৈরির সময় কেবল মানুষের চাপ এড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হয়, তাহলে পথটি জলবায়ুগত ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। আবার শুধু জলবায়ুর বিষয়টি বিবেচনা করলে মানুষের তৈরি বাধাগুলি উপেক্ষিত থেকে যায়। তাই উভয় ঝুঁকিকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে সবচেয়ে কার্যকর চলনপথ পরিকল্পনায়। স্থির ও পরিবর্তনশীল চলনপথের তুলনায়ও বড় পার্থক্য দেখা গেছে। ২০১০ সালের পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত একটি স্থির চলনপথ শতাব্দীর শেষে উভচর প্রাণীদের জন্য দ্বিগুণেরও বেশি জলবায়ুগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিপরীতে নিয়মিত হালনাগাদ করা চলনপথে জলবায়ুজনিত চাপ ৬০ শতাংশেরও বেশি এবং মানবসৃষ্ট চাপ প্রায় অর্ধেক কমে যায়। গবেষণায় আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলি ভবিষ্যতে প্রাণীদের চলাচলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে এগুলির গুরুত্ব কম মনে হলেও পরবর্তী দশকগুলিতে এগুলি পদক্ষেপের সোপান বা মধ্যবর্তী আশ্রয়স্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি অবশ্য বাস্তব প্রাণীর চলাচলের পর্যবেক্ষণ নয়, সম্ভাব্য উপযুক্ত পথের একটি মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণ। তবু গবেষণার মূল বার্তাটি স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের পৃথিবীতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের পরিকল্পনাকেও হতে হবে পরিবর্তনশীল। কারণ প্রাণীরা ইতিমধ্যেই নতুন আবাসস্থলের খোঁজে স্থান বদলাতে শুরু করেছে। তাই কয়েক দশক আগের মানচিত্রে আঁকা পথের উপর ভরসা না করে ভবিষ্যতের পরিবর্তন মাথায় রেখেই গড়তে হবে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের পথ।

 

সূত্র: Earth . com ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve − three =