বনের প্রাণী মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়লে বিভিন্ন দেশে তার প্রতিক্রিয়া হয় একেবারে ভিন্ন। কোথাও বনকর্মীরা হয়তো প্রাণীটিকে গুলি করার প্রস্তুতি নেবেন। আবার অন্য কোথাও চেষ্টা চলবে তাকে নিরাপদে ধরে জঙ্গলে ফিরিয়ে দেওয়ার। একই ধরনের পরিস্থিতি, অথচ সিদ্ধান্ত একেবারে আলাদা। কেন? নতুন গবেষণা বলছে, এর উত্তর বর্তমানের আইন, অর্থনীতি বা প্রশাসনে নেই। বরং মানুষের বন্যপ্রাণীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে শত শত বছরের ইতিহাস, ধর্মীয় চিন্তা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবে। গবেষকেরা বলছেন, সাধারণভাবে মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী নিয়ে দুটি মানসিকতা দেখা যায়। একটি হল ‘মিউচুয়ালিজম’ বা সহাবস্থানের ভাবনা। এতে মানুষ প্রাণীদেরও সমাজের অংশ হিসেবে দেখে। অন্যটি ‘ডমিনেশন’ বা আধিপত্য বিস্তারের ভাবনা, যেখানে প্রাণীকে মূলত মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ইউরোপ ও আমেরিকার ৩৩টি দেশের প্রায় ১৮,৫০০ মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করেন। তাতে জানা যায়, একদল মানুষ প্রাণীদেরও পৃথিবীতে একসঙ্গে বসবাসকারী জীব হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, মানুষই প্রকৃতির নিয়ন্ত্রক, তাই প্রয়োজন হলে প্রাণীকে সরানো বা মেরে ফেলাই স্বাভাবিক। লাতিন আমেরিকার দেশগুলিতে সহাবস্থানের মানসিকতা অনেক বেশি শক্তিশালী। সেখানে জাগুয়ার বা অন্য শিকারি প্রাণী মানুষের এলাকায় এলে অনেক সময় আগে তাদের সরিয়ে নেওয়া বা সহাবস্থানের পথ খোঁজা হয়। বিপরীতে উত্তর আমেরিকার বহু এলাকায় মানুষের নিরাপত্তা বা কৃষির ক্ষতির আশঙ্কায় দ্রুত প্রাণী হত্যার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পার্থক্যের শিকড় রয়েছে ঔপনিবেশিক অতীতে। উত্তর ইউরোপে ও ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রকৃতির উপর মানুষের আধিপত্যের ধারণা বেশি জোর পেয়েছে। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতির প্রভাব এখনও অনেক জায়গায় টিকে রয়েছে, যেখানে মানুষ ও প্রাণীকে একই পরিবেশের অংশ হিসেবে দেখা হয়। আর এই মানসিকতা আজও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। যে নীতি এক দেশে সফল, অন্য দেশে তা ব্যর্থ হতে পারে শুধু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণে। আসলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আসলে প্রাণীটিকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বহু পুরনো বিশ্বাস, আর প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কটা ঠিক কেমন হবে, সেই ধারণা।
সূত্র: Enduring cultural legacies affect Euro-American wildlife values ; Nature Sustainibility ; 15 May 2026
