জল জমে বরফে পরিণত হয়—এ এক অত্যন্ত পরিচিত ঘটনা। কিন্তু তরল পদার্থ ঠিক কীভাবে জমে কঠিনে পরিণত হয়, তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও এক বড় রহস্য। প্রায় ১৫০ বছর ধরে এ নিয়ে নানা তত্ত্ব তৈরি হলেও পরীক্ষার ফলের সঙ্গে সেগুলির মিল অনেক সময়ই পাওয়া যায় না। কখনও কখনও হিসাব ও বাস্তবের মধ্যে পার্থক্য ১০-এর ২০ ঘাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে বিজ্ঞানীরা এখন ব্যবহার করছেন জার্মানির ইউরোপিয়ান এক্স-রে ফ্রি ইলেকট্রন লেজার (XFEL),যা বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এক্স-রে লেজার। হামবুর্গের কাছে অবস্থিত এই গবেষণা কেন্দ্রে আলোর গতির কাছাকাছি বেগে ছুটে চলা ইলেকট্রন থেকে উৎপন্ন শক্তিশালী এক্স-রে রশ্মির সাহায্যে তরল জমাট বাঁধার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ মিশেল পারিনেলোর মতে, এই সমস্যার সমাধান কঠিন, কারণ পরীক্ষা, তত্ত্ব এবং কম্পিউটার সিমুলেশন — সবই অত্যন্ত জটিল। সামান্য একটু ভুলও ফলাফলে বিশাল পার্থক্য তৈরি করতে পারে। এই গবেষণার গুরুত্ব শুধু বরফ জমার প্রক্রিয়া বোঝার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মেঘে বরফকণা তৈরির প্রক্রিয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস, এমনকি পৃথিবীর অন্তঃকেন্দ্র ও অন্যান্য গ্রহের গঠন সম্পর্কেও এ থেকে নতুন তথ্য মিলতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ার প্রথম কয়েক মাইক্রোসেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এতে দেখা যাচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা বা ‘ডিসঅর্ডার’-এর ভূমিকা আগে যা ধারণা করা গিয়েছিল তার চেয়ে বেশি। এ বিষয়ে আধুনিক তত্ত্বের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন মার্কিন বিজ্ঞানী জোসিয়া উইলার্ড গিবস। তাঁর মতে, হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা নামলে তরলের অণুগুলি চায় সুশৃঙ্খল কেলাস কাঠামো গড়ে তুলতে। কিন্তু খুব ছোট কেলাস স্থিতিশীল হতে পারে না। নির্দিষ্ট আকারে পৌঁছানোর পর তবেই সেগুলি স্থায়ীভাবে বেড়ে উঠতে শুরু করে। এই ধারণা থেকেই পরে ‘ক্লাসিক্যাল নিউক্লিয়েশন থিয়োরি’ তৈরি হয়। তবে বাস্তবে তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও জমাট বাঁধার গতিতে বিপুল প্রভাব ফেলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, বিশুদ্ধ জলের একটি ক্ষুদ্র ফোঁটা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কয়েকশো কোটি বছরেও না জমতে পারে, অথচ আরও ১৫ ডিগ্রি ঠান্ডা হলে তা এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে বরফে পরিণত হতে পারে। চরম এই সংবেদনশীলতার কারণেই জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া নিয়ে নির্ভুল পরীক্ষা ও তত্ত্ব তৈরি করা কঠিন। তবে নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা ধীরে ধীরে এই দীর্ঘদিনের বৈজ্ঞানিক রহস্যের সমাধানের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছেন।
সূত্র: Nature; June ; 2026
