ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির আমলের এক বিস্ময়কর ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন গবেষকেরা। রাজা যখন দেশজুড়ে মঠগুলি ভেঙে ফেলে সেখানকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন তাঁর এক বিশ্বস্ত কর্মচারী গোপনে রক্ষা করেছিলেন একটি ক্যাথলিক ধর্মগ্রন্থ, যেটি আসলে ধ্বংস করার ভার ছিল তাঁর ওপর।
বইটির নাম ‘মিরর অফ দ্য ব্লেসেড লাইফ অফ জেসাস ক্রাইস্ট।’ পঞ্চদশ শতকের গোড়ায় নিকোলাস লাভ একটি লাতিন ধর্মীয় গ্রন্থ অবলম্বনে এটি ইংরেজিতে রচনা ও অনুবাদ করেন। সেই সময় ইংরেজিতে বাইবেল পড়ার প্রবণতা নিয়ে প্রবল বিতর্ক চলছিল। লোলার্ড নামে একটি ধর্মীয় সংস্কারপন্থী গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের জন্য ইংরেজিতে বাইবেল পড়ার অধিকার দাবি করেছিল। কিন্তু ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করার জন্য তাঁদের অনেককে কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছিল।
নিকোলাস লাভের বইটি অবশ্য তৎকালীন ক্যান্টারবেরির আর্চবিশপ টমাস অ্যারান্ডেলের অনুমোদন পেয়েছিল। ফলে এটি ক্যাথলিক ধর্মমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও নিরাপদ গ্রন্থ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৪৮৬ সালে উইলিয়াম ক্যাক্সটন বইটির মুদ্রিত সংস্করণ প্রকাশ করেন। কিন্তু ষোড়শ শতকে ইংল্যান্ডে ধর্মসংস্কার আন্দোলন শুরু হলে বইটির কিছু ধর্মীয় বক্তব্য বিতর্কিত হয়ে ওঠে এবং এর মুদ্রণ বন্ধ হয়ে যায়।
এই সময়েই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে স্যর জন গেজের ভূমিকা। তিনি ছিলেন অষ্টম হেনরির বিশ্বস্ত রাজকর্মচারী। ১৫৩৬ সাল থেকে শুরু হওয়া মঠ বিলোপের অভিযানে সারে, কেন্ট ও সাসেক্স অঞ্চলের মঠগুলির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গেজ নিজে ক্যাথলিক ধর্মবিশ্বাসে অটল ছিলেন। ইংল্যান্ডের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাটি ওয়াল্টার এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস ওয়েডের গবেষণায় উঠে এসেছে এইসব চমকপ্রদ তথ্য। গবেষণাটির বিবরণ বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে নোটস অ্যান্ড কোয়ারিস পত্রিকায়। গবেষণার পদ্ধতিটি চমকপ্রদ।
গবেষকেরা ইংল্যান্ডের ব্রাইটনের ‘দ্য কিপ’ আর্কাইভে সংরক্ষিত একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপির ছয়টি বিচ্ছিন্ন পৃষ্ঠা শনাক্ত করেন। সেগুলির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেইনেকে গ্রন্থাগারে রাখা একটি পাণ্ডুলিপির মিল খুঁজে পান তাঁরা। লেখার ধরন, বিষয়বস্তু এবং মূল পাণ্ডুলিপির একটি ফাঁকা অংশের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁরা নিশ্চিত হন যে পৃষ্ঠাগুলি একই বইয়ের অংশ। পাণ্ডুলিপিটির শেষ পাতায় জন গেজের স্বাক্ষরও রয়েছে।
তবে বইটি কীভাবে তাঁর হাতে এসেছিল, তা এখনও নিশ্চিত নয়। মঠ থেকে তিনি নিজেই বইটি নিয়ে এসেছিলেন, নাকি অন্য কেউ গোপনে সরিয়ে পরে তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল, পুরোটাই অজানা।
ধর্মীয় সংঘাত ও ধ্বংসের সময়েও কিছু মানুষ নীরবে জ্ঞান ও ঐতিহ্যকে রক্ষা করেন। রাজকীয় দায়িত্ব পালন করেও জন গেজ যে নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে আপস করেননি, এই পাণ্ডুলিপি তারই এক বিরল ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।
সূত্র: https://scitechdaily.com/scientists-uncover-a-500-year-old-secret-hidden-in-a-book-henry-viii-wanted-destroyed/
