বিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার কীভাবে হয়? 

বিজ্ঞানে যুগান্তকারী আবিষ্কার কীভাবে হয়? 

সুপর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১১ জুলাই, ২০২৬

শতাব্দীর পর শতাব্দী বিজ্ঞানচর্চার জগৎ মূলত কয়েকজন অসাধারণ প্রতিভাধর মানুষের হাতেই পরিচালিত হয়েছে। তাঁরাই নোবেল পুরস্কার জিতেছেন, কোটি কোটি ডলারের গবেষণা অনুদান পেয়েছেন এবং বিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক নতুন করে লিখেছেন। অন্যদিকে, অধিকাংশ গবেষক যেন এই মহীরুহদের ছায়াতেই কাজ করে গেছেন। কিন্তু যে প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে, তা হল, একজন বিজ্ঞানীর সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও নতুন ধারণা তৈরির দক্ষতা কি কমে যাচ্ছে?

 

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এই প্রশ্নের একটি নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গবেষকরা ১৯৬০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ১ কোটি ২০ লক্ষেরও বেশি বিজ্ঞানীর গবেষণাকর্ম বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণার ফলাফল ‘সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। যেখানে দেখা যাচ্ছে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানীদের বিদ্যমান ধারণার মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরির ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সম্পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক ধারণা উপস্থাপনের ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। গবেষকরা বৈজ্ঞানিক সৃজনশীলতাকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমটি ‘ডিসরাপটিভ ইনোভেশন’। অর্থাৎ এমন আবিষ্কার বা ধারণা, যা প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে একটি ক্ষেত্রের গতিপথই বদলে দেয়। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ বা ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কার তার উদাহরণ। দ্বিতীয়টি ‘কানেকটিভ নভেলটি’। অর্থাৎ আগে থেকেই বিদ্যমান বিভিন্ন ধারণার মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা। দেখা যাচ্ছে, কর্মজীবনের প্রথম দিকে বিজ্ঞানীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ডিসরাপটিভ বা বৈপ্লবিক আবিষ্কার করেন। অন্যদিকে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বিদ্যমান জ্ঞানের মধ্যে নতুন সম্পর্ক খুঁজে বের করতে বেশি দক্ষ হয়ে ওঠেন।

এই প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে বিজ্ঞান কল্পকাহিনির লেখক ডগলাস অ্যাডামসের একটি বিখ্যাত পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করা যায়। একজন মানুষের বৌদ্ধিক জীবনের শুরুতে যা বিদ্যমান থাকে, তা স্বাভাবিক বলে মনে হয়। কর্মজীবনের প্রথম দিকে যা আসে, তা বিপ্লবাত্মক মনে হয়। আর পরিণত বয়সে নতুন যা কিছু আবির্ভূত হয়, তা অনেক সময় সন্দেহজনক বলে মনে হতে পারে। গবেষকরা এই প্রবণতার নাম দিয়েছেন ‘নস্টালজিয়া ইফেক্ট’। আসলে বিজ্ঞানীরা যত বেশি অভিজ্ঞ হন, ততই তারা তাঁদের কর্মজীবনের ভিত্তিতে গড়ে তোলা ধারণাগুলির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। ফলে সেই ভিত্তিকে প্রশ্ন করা বা পরিবর্তন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

 

ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জীবনই এই দ্বন্দের এক উদাহরণ। ১৯০৫ সালে, মাত্র ২৬ বছর বয়সে, তিনি চারটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করে পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তিই বদলে দিয়েছিলেন। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ, ভর-শক্তির সমতুল্যতা (E=mc²), ফটোইলেকট্রিক প্রভাব এবং ব্রাউনিয়ান গতি নিয়ে তাঁর গবেষণা আজও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে সেই আইনস্টাইনই উদীয়মান কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনেক মৌলিক ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। অর্থাৎ, যিনি একসময় প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছিলেন, তিনিই পরে নতুন বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রতি সংশয়ী হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে বিতর্ক করে আসছেন। কেউ মনে করেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৃজনশীলতা কমে যায়। আবার কেউ বলেন, তরুণ গবেষকেরা নতুন ক্ষেত্রের সূচনা করলেও, প্রবীণ বিজ্ঞানীরাই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সাহায্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তার নতুন দিকনির্দেশনা তৈরি করেন।

 

এই গবেষণা প্রকাশের পর বিজ্ঞানমহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উদ্ভাবনের গতি কি সত্যিই কমে যাচ্ছে? একই সঙ্গে, আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার কাঠামো, গবেষণা পদ্ধতি এবং উদ্ভাবনের প্রকৃতি নিয়েও নতুন করে আত্মসমালোচনা শুরু হয়েছে। গবেষকদের মতে, এই বিতর্ক ভবিষ্যতে বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনের বিকাশ নিয়ে আরও গভীর গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে। গবেষণাটিতে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ‘ডিসরাপটিভ’ বা যুগান্তকারী চরিত্র পরিমাপের জন্য সিডি (CD) ইনডেক্স ব্যবহার করা হয়। এটি মূলত গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি বা সাইটেশনের উপর ভিত্তি করে তৈরি। ভাবা হয়, কোনো গবেষণা যদি সত্যিই যুগান্তকারী হয়, তাহলে পরবর্তী গবেষণাগুলি সেটিকে উদ্ধৃত করবে, কিন্তু তার পূর্ববর্তী গবেষণাগুলিকে তুলনামূলকভাবে কম উদ্ধৃত করবে। অন্যদিকে, যদি কোনো গবেষণা বিদ্যমান জ্ঞানকে আরও সুসংহত করে, তাহলে নতুন ও পুরনো উভয় গবেষণাই সমানভাবে উদ্ধৃত হতে থাকবে। ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে একটি মাত্র গবেষণাপত্রই নতুন বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রের সূচনা করেছে। যেমন, ১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কার বা ১৯৯৫ সালে মিশেল মেয়র ও দিদিয়ে কেলোজের প্রথম বহির্গ্রহ আবিষ্কার। তবে সব বৈজ্ঞানিক বিপ্লব একক আবিষ্কার থেকে আসে না। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রত্যক্ষ শনাক্তকরণের মতো বহু যুগান্তকারী সাফল্য দীর্ঘদিনের সম্মিলিত গবেষণার ফল। গবেষকরা মনে করিয়ে দেন, বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন কারণে গবেষণাপত্র উদ্ধৃত করেন। তাই বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের পরিবর্তনশীল ধারা বোঝার ক্ষেত্রে উদ্ধৃতির ধরন ও গবেষণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট দুটিকেই বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আরও একটি সম্ভাবনার কথাও তাঁরা উল্লেখ করেন। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞানীরা হয়তো আগের তুলনায় গবেষণার ছোট ছোট অগ্রগতিগুলিকেও আলাদা গবেষণাপত্র হিসেবে প্রকাশ করছেন। কিন্তু অতীতে তাঁরা আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতেন। ফলে, বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের প্রকৃতি ও গতি বোঝার জন্য ভবিষ্যতে গবেষকদের আরও গভীর বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকারভিত্তিক গবেষণা এবং গবেষকদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান চালাতে হবে।

 

তাছাড়া আধুনিক বিজ্ঞান ক্রমশ বৃহৎ গবেষণা-দল এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। একই স্থানে কাজ করা ছোট ও বৈচিত্র্যময় দল অনেক সময় দূরবর্তী বড় দলের তুলনায় বেশি যুগান্তকারী আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। মুখোমুখি আলোচনা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের ধারণার সরাসরি বিনিময় সৃজনশীলতাকে বাড়িয়ে দেয়। বিশ শতকের প্রভাবশালী পদার্থবিদ ও বিজ্ঞান- দার্শনিক টমাস কুন বৈজ্ঞানিক জগতে ‘প্যারাডাইম শিফট’ বা জ্ঞান-বিপ্লবের ধারণাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন। তাঁর মতে, অনেক সময় অপ্রত্যাশিত নতুন প্রমাণ বা আবিষ্কার একটি গবেষণাক্ষেত্রের প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে বিজ্ঞানকে নতুন পথে পরিচালিত করে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব গবেষক-দল বিভিন্ন শাখা ও জ্ঞান-সম্প্রদায়ের মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে পারে, তাদের মধ্যেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাঁরা এই ধারণার নাম দিয়েছেন ‘স্ট্রাকচারাল ডাইভার্সিটি’। অর্থাৎ, একই বিষয়ে বহু মানুষের কাজের চেয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করা মানুষের সহযোগিতা অনেক সময় বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে।

 

আবার অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিজ্ঞান ক্রমশ আরও সংকীর্ণ ও বিশেষায়িত শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ছে, যা নতুন ধারণা ও আন্তঃবিষয়ক আবিষ্কারের পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। আধুনিক গবেষণা ব্যবস্থায় বিজ্ঞানীরা ক্রমশ ‘নিরাপদ’ গবেষণার দিকে ঝুঁকছেন। কারণ, গবেষণা অনুদান, পদোন্নতি এবং প্রকাশনার চাপ অনেক সময় উচ্চ-ঝুঁকির গবেষণাকে নিরুৎসাহিত করে। এমন একটি গবেষণা প্রকল্পে কাজ করা, যার ফলাফল অনিশ্চিত, অনেক বিজ্ঞানীর কাছেই পেশাগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

 

তবে কিছু গবেষকের মতে, বর্তমান সংকট শুধুমাত্র বিজ্ঞানের নয়, বরং তথ্যের অতিরিক্ত চাপের যুগে গোটা সমাজেরই সমস্যা। প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ তথ্যের ভিড়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষকদের সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন, এআই বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন জ্ঞানের সারসংক্ষেপ তৈরি করতে, গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার দিক নির্দেশ করতে বা সম্ভাব্য যুগান্তকারী গবেষণা চিহ্নিত করতে সাহায্য করতে পারে। বিজ্ঞানের প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এই ধরনের প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইকেল পার্ক ও তাঁর সহকর্মীদের গবেষণা দেখিয়েছে, বিজ্ঞান কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে কোন পথে এগোতে পারে, তা বোঝার জন্য আরও গভীর ও বহুমাত্রিক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। সেই পথ শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, জ্ঞানের সংহতি, কিংবা থমাস কুনের ভাষায় আরেকটি ‘প্যারাডাইম শিফট’-এর দিকেও নিয়ে যেতে পারে।

 

তাই বিজ্ঞানের অগ্রগতি শুধুমাত্র তরুণ বা প্রবীণ, কোনো একটি প্রজন্মের উপর নির্ভর করে না। তরুণ গবেষকেরা যেখানে প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন, সেখানে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানীরা বিচ্ছিন্ন জ্ঞানকে একত্রিত করে নতুন পথ তৈরি করেন। হয়তো সেই কারণেই বিজ্ঞানের ইতিহাসে আইনস্টাইন যেমন অপরিহার্য, তেমনই প্ল্যাঙ্কও অপরিহার্য। আর তাই, ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের শতবর্ষ পুরোনো উক্তিটি আজও নতুন করে ভাবায়, “বিজ্ঞান হয়তো সত্যিই এক একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে?

 

সুত্র: Is This Why Science Advances One Funeral at a Time? ; Nature

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

14 + 1 =