জিনোমিক্সের দ্রুত পরিবর্তনশীল জগতে এক সাহসী প্রথিতযশা নাম ছিল জন ক্রেগ ভেন্টার। তাঁর মৃত্যুতে থেমে গেল এমন এক কণ্ঠ, যা বিজ্ঞানের প্রচলিত ধ্যানধারণা ভেঙে নতুন পথ দেখাতে কখনো দ্বিধা করেনি। তাঁর যুগান্তকারী চিন্তাধারা মানুষের জিনগত গঠনকে বোঝার পথে বিশ্বকে এক নতুন যুগে প্রবেশ করিয়েছিল। ৭৯ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান ঘটলো। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জন ক্রেগ ভেন্টার ইন্সটিটিউট জানিয়েছে ক্যান্সার চিকিৎসাজনিত জটিলতায় সান ডিয়েগোতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
১৯৯০-এর দশকে, যখন হিউম্যান জিনোম প্রোজেক্ট ধীরে ধীরে একটা সুসংগঠিত গতিতে এগোচ্ছিল, তখন ভেন্টার সাহসিকতার সঙ্গে এক ভিন্ন কৌশল নিয়ে হাজির হন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেলেরা জিনোমিক্স দ্রুতগতির ডিএনএ সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। বিজ্ঞানজগতে এ ছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিযোগিতা । সেখানে সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা একইসঙ্গে কাজ করেছিল। সরকারি বনাম বেসরকারি, ধীরস্থিরতা বনাম দ্রুত উদ্ভাবন। অবশেষে ২০০০ সালে উভয় পক্ষ যৌথভাবে ঘোষণা করে যে মানুষের জিনোমের ৩.১ বিলিয়ন ডিএনএ বেস পেয়ার ম্যাপ করা সম্ভব হয়েছে। ২০০৩ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।
এই সাফল্যের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। মানুষের শরীরে জিন কীভাবে কাজ করে, কোনো একটা রোগের পিছনে কেন একটাই নির্দিষ্ট জিন দায়ী ? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে যায়। ক্যান্সার, হৃদরোগসহ নানা জটিল অসুখের জেনেটিক ভিত্তি বোঝা সহজ হয়। এরফলে চিকিৎসাবিজ্ঞান ধীরে ধীরে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং ব্যক্তিনির্দিষ্ট চিকিৎসার এক শক্তপোক্ত ভিত গঠিত হয়, যার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের জিনগত গঠন অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সম্ভব।
শুধু জিনোম ম্যাপিং নয়, ভেন্টার সিন্থেটিক বায়োলজিতেও অসাধারণ অবদান রাখেন। সিন্থেটিক বায়োলজির ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী প্রথমবারের মতো ল্যাবে তৈরি কৃত্রিম ডিএনএ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি জীবন্ত ব্যাকটেরিয়া কোষ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। তার এই সাফল্যই জীববিজ্ঞানকে এক নতুন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। জীবন কি কেবল প্রকৃতির সৃষ্টি, নাকি মানুষের হাতেও তার নির্মাণ সম্ভব? এই সাফল্য জীববিজ্ঞান ও প্রকৌশলের মধ্যকার সীমারেখাকে মুছে দিয়ে দুটিকে এক সুতোয় বাঁধে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতের জৈবপ্রযুক্তির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ব্যক্তিগত স্তরেও তিনি ছিলেন সাহসী ও স্বচ্ছতার প্রতীক। তাঁর জীবনের অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে তিনি নিজের জিনোম প্রকাশ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈশিষ্ট্য ও রোগের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণাকে ত্বরান্বিত করা এবং বিজ্ঞানকে সকলের সামনে আরও উন্মুক্ত করা। তাঁর জীবনের শুরুটা ছিল একেবারেই ভিন্নধর্মী। কর্মজীবনের প্রারম্ভে তিনি মার্কিন নৌবাহিনীতে যোগ দেন এবং ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মধ্যে জীবন ও মানবদেহ সম্পর্কে গভীর কৌতূহল সৃষ্টি করে। আর সে কৌতূহলই পরবর্তীতে তাঁকে বিজ্ঞানের শীর্ষ গবেষণার দ্বারে তাকে পৌঁছে দেয়।
জে. ক্রেগ ভেন্টার ছিলেন একাধারে দৃষ্টান্তমূলক বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক এবং সাহসী ও দূরদর্শী চিন্তাবিদ। তাঁর অবদান শুধু ল্যাবরেটরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানবজাতির নিজের অস্তিত্বকে বোঝার যাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর এই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রস্থান সেই যাত্রায় এক গভীর শূন্যতা তৈরি করলেও, তাঁর কাজ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকে পথ দেখিয়ে যাবে। তাঁর অবদান আজও আমাদের শরীর, স্বাস্থ্য এবং জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলিকে নতুনভাবে বুঝতে সাহায্য করছে, এবং ভবিষ্যতেও করবে।
সূত্র: Associated Press (AP)
