বিনা চুম্বকে ইলেকট্রনের গতি নিয়ন্ত্রণ 

বিনা চুম্বকে ইলেকট্রনের গতি নিয়ন্ত্রণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ মে, ২০২৬

এতদিন ইলেকট্রনের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে চৌম্বক পদার্থ, বিদ্যুৎ কিংবা ব্যাটারির প্রয়োজন হতো। কিন্তু সম্প্রতি ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা দেখালেন, শুধুমাত্র পরমাণুর বিশেষ ধরনের কম্পনের মাধ্যমেই ইলেকট্রনের গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এই নব আবিষ্কৃত প্রযুক্তি ভবিষ্যতে আরও দ্রুত, শক্তি-সাশ্রয়ী এবং ক্ষুদ্রাকৃতি কম্পিউটার তৈরির পথ খুলে দিতে পারে।

গবেষণাটির কেন্দ্রে রয়েছে কাইরাল ফোনোন নামের এক বিচিত্র কোয়ান্টাম প্রভাব। সাধারণভাবে কোনো কঠিন পদার্থের ভেতরকার পরমাণুগুলো স্থির থাকে না; তারা সবসময় কম কম্পনেও কাঁপতে থাকে। এই কম্পনগুলো তরঙ্গের মতো পুরো পদার্থে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ফোনন। কিন্তু কিছু বিশেষ পদার্থ, যেমন- কোয়ার্টজে, পরমাণুগুলোর বিন্যাস সর্পিল বা পাকানো ধরনের হয়। এর ফলে তাদের কম্পনও সরলরেখায় হয় না , বরং বৃত্তাকার বা পাক খাওয়া গতিতে ঘটে। এই বিশেষ পাকানো কম্পনই হলো কাইরাল ফোনন।

গবেষকেরা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করেছেন যে এই কাইরাল ফোনন সরাসরি ইলেকট্রনের কাছে “অরবিটাল অ্যাঙ্গুলার মোমেন্টাম’’ বা কক্ষীয় কৌণিক ভরবেগ স্থানান্তর করতে পারে। সহজভাবে বলতে গেলে, ইলেকট্রনকে দিয়ে কোনো চুম্বক ছাড়াই ঘুরিয়ে তথ্য বহন করানো সম্ভব। এই ধারণার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠছে অরবিট্রনিক্স নামক নতুন প্রযুক্তিক্ষেত্র।

বর্তমান ইলেকট্রনিক যন্ত্রে তথ্য পরিবহন ঘটে মূলত ইলেকট্রনের চার্জ ব্যবহার করে। স্পিনট্রনিক্স প্রযুক্তিতে ইলেকট্রনের স্পিন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু অরবিট্রনিক্স আরও এক ধাপ এগিয়ে নিউক্লিয়াস ঘিরে ইলেকট্রনের ঘোরার গতিকেই তথ্যবাহক হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। এর বড় সুবিধা হলো এতে কম শক্তি লাগে এবং তথ্য পরিবহন অনেক দ্রুত হতে পারে।

এই গবেষণার আরেকটি বড় দিক হলো, এতে ব্যয়বহুল ও বিরল চৌম্বক ধাতুর প্রয়োজন হয় না। কোয়ার্টজের মতো সস্তা ও সহজলভ্য পদার্থ দিয়েই এই ক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন,কাইরাল ফোননের কারণে কোয়ার্টজ নিজেই এক ধরনের ক্ষুদ্র অভ্যন্তরীণ চৌম্বক ক্রিয়া তৈরি করে। ফলে বাইরের বড় চুম্বক ছাড়াই ইলেকট্রনের গতিকে প্রভাবিত করা যায়।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা α-কোয়ার্টজ কেলাসের উপর টাংস্টেন ও টাইটেনিয়ামের স্তর বসিয়ে পরীক্ষাটি চালান। তারা লক্ষ্য করেন, পরমাণুর পাকানো কম্পন ইলেকট্রনের মধ্যে একধরনের অরবিটাল প্রবাহ সৃষ্টি করছে। এই নতুন প্রভাবের নাম দেওয়া হয়েছে “অরবিটাল সিবেক ইফেক্ট’’।

গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি শুধু কোয়ার্টজেই সীমাবদ্ধ নয়। টেলুরিয়াম, সেলেনিয়াম এবং কিছু আধুনিক জৈব/ অজৈব সংকর পদার্থেও একই ক্রিয়া ব্যবহার করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এই আবিষ্কার শক্তি-সাশ্রয়ী সুপারকম্পিউটার, উন্নত মেমোরি ডিভাইস এবং অতিদ্রুত কোয়ান্টাম প্রযুক্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। একসময় যা কল্পনাতীত ছিল, আজ সেটিই বাস্তবের পথে। পরমাণুর সূক্ষ্ম পাকানো কম্পন হয়তো আগামী প্রজন্মের কম্পিউটারের শক্তি হয়ে উঠতে চলেছে।

 

সূত্র: Orbital Seebeck effect induced by chiral phonons by Yoji Nabei, Cong Yang, published in Nature Physics, 2026; 22 (2): 245 DOI: 10.1038/s41567-025-03134-x

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × 5 =