পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম অ্যাক্সোলটল। অনেকেই একে “মেক্সিকান ওয়াকিং ফিশ” নামে চেনেন। কিন্তু নামের সঙ্গে “ফিশ” বা মাছ শব্দটি থাকলেও এটি আসলে মাছ নয়, একটি উভচর প্রাণী। অদ্ভুত চেহারা, শরীরের অঙ্গ পুনর্গঠনের অসাধারণ ক্ষমতা এবং সীমিত আবাসস্থলের কারণে প্রাণীটি দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তবে বর্তমানে এই বিরল উভচর প্রাণীটি বিলুপ্তির গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে। অ্যাক্সোলটল মোল স্যালাম্যান্ডার গোষ্ঠীর সদস্য, যেখানে মোট ৩২টি প্রজাতি রয়েছে। এই গোষ্ঠীর আরেক পরিচিত সদস্য টাইগার স্যালাম্যান্ডার। আকারের দিক থেকে অ্যাক্সোলটল তুলনামূলকভাবে বড় উভচর প্রাণী। সাধারণত এদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯ ইঞ্চি। এদের চোখ বড় ও কিছুটা উঁচু, যা সবসময় কালো রঙের দেখায়। তবে এর বাহ্যিক ফুলকার মতো অঙ্গ, যা মাথার পিছন থেকে ঝুলে থাকে এবং দেখতে অনেকটা রঙিন অলংকারের মতো – এটিই এর সবথেকে বড় পরিচিতি। বন্য পরিবেশে অ্যাক্সোলটলের জীবনযাপন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। আসলে বর্তমানে অধিকাংশ অ্যাক্সোলটলই গবেষণাগার বা ব্যক্তিগত সংগ্রহে বন্দি অবস্থায় রয়েছে। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, এরা মূলত নিশাচর শিকারি। দিনের বেলা লুকিয়ে থাকলেও রাতে বের হয়ে ছোট মাছ, কৃমি ও জলজ প্রাণী শিকার করে। খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও এদের বিশেষ কৌশল লক্ষ্য করা যায়। এরা মুখের সাহায্যে হঠাৎ জল টেনে নিয়ে শিকারকে গিলে ফেলে। এ সময় ছোট পাথর বা বালুকণাও শরীরে প্রবেশ করে, যা তাদের হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। অন্যদিকে অধিকাংশ স্যালাম্যান্ডারের মতো অ্যাক্সোলটলের বাবা-মাও সন্তানের যত্ন নেয় না। মিলনের পর পুরুষ প্রাণীর ভূমিকা শেষ হয়ে যায়। অ্যাক্সোলটলের বিভিন্ন রঙ বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয়। বর্তমানে বন্য প্রকৃতির গাঢ় সবুজ বা কালচে রঙের পাশাপাশি সম্পূর্ণ কালো, নীলাভ, সাদা এবং অ্যালবিনো রঙের অ্যাক্সোলটল দেখা যায়। রঙের এই বৈচিত্র্যের পেছনে কয়েকটি আবৃত জিন কাজ করে। প্রাকৃতিকভাবে এদের আবাসস্থল অত্যন্ত সীমিত। শুধুমাত্র মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো শহরের দক্ষিণে অবস্থিত জোচিমিলকো হ্রদেই এদের দেখা পাওয়া যায়। একসময় এটি ছিল বিশাল হ্রদব্যবস্থা, কিন্তু নগরায়ণের ফলে এখন অনেকাংশ খালে পরিণত হয়েছে। ঐ একই কারণে গত কয়েক দশকে অ্যাক্সোলটলের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় পর্যবেক্ষণ ও অবমুক্তকরণের জন্য মাত্র ২৩টি বন্য অ্যাক্সোলটল ধরা পড়ে। অথচ কয়েক দশক আগে এদের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। বিজ্ঞানীদের এদের বিষয়ে আগ্রহের প্রধান কারণ, এদের অবিশ্বাস্য পুনর্জননের ক্ষমতা। শরীরের কোনো অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এটি নতুন করে সেই অঙ্গ গড়ে তুলতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যাক্সোলটল শুধু হাত-পা নয়, চোখ, হৃদপিণ্ডের অংশ এবং এমনকি মস্তিষ্কের কিছু অংশও পুনর্গঠন করতে সক্ষম। এই বৈশিষ্ট্য মানবদেহের ক্ষত নিরাময় ও অঙ্গ পুনর্গঠন সংক্রান্ত গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। তবে দ্রুত সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে প্রকৃতিতে অ্যাক্সোলটলের অস্তিত্ব একদিন হারিয়ে যেতে পারে। তাই এই অনন্য প্রাণীকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
সূত্র: Earth . com ; June ; 2026
