বিশ্ববীণারবে/ পর্ব ৩

বিশ্ববীণারবে/ পর্ব ৩

মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি নিয়ে কিছু কথা

মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের দিকে শহর থেকে দূরে কোথাও কোনও মাঠের মধ্যে রাতের দিকে আকাশের দিকে তাকানো গেলে, যখন কুয়াশা থাকে না, আর চাঁদও ওঠেনি; তখন দক্ষিণ পূর্ব দিকে তাকিয়ে ভালো করে লক্ষ্য করলে অবশ্যই খালি চোখেই দেখা যাবে আকাশের এক দিক থেকে অন্য দিকে একটা লম্বা রেখা বরাবর ঝাঁকে ঝাঁকে তারার গুচ্ছ।  ছবিতে দেখা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশগঙ্গা ছায়াপথ যে ওটাই, সেটা আর বলে দিতে হবে না কাউকে। ওই ছায়াপথেরই একটা অত্যন্ত ক্ষুদ্র উপাদান আমাদের সূর্য, আর সেই সূর্যেরই চারপাশে তার তুলনায় অনেক ছোট একটা গ্রহ এই পৃথিবী।

ছবি – মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি। সৌজন্যে নাসা।

 

‘মিল্কিওয়ে’ গ্যালাক্সি বা ‘আকাশগঙ্গা’ ছায়াপথের আকার প্যাঁচাল, বা স্পাইরাল। এছাড়াও উপবৃত্তাকার ছায়াপথ হয়, যেগুলো দেখতে হয় এইরকম—

ছবি- উপবৃত্তাকার গ্যালাক্সি।

এই উপবৃত্তাকার ধরনের গ্যালাক্সির ওপর নীচে চ্যাপ্টা। সাধারণত গ্যালাক্সিদের যে ঝাঁক, যাকে ক্লাস্টার বলে, সেই ক্লাস্টারের কেন্দ্রের কাছাকাছি এই ধরনের গ্যালাক্সির দেখা মেলে। ছায়াপথের গঠন-বৈচিত্র্য বা সৃষ্টির বিভিন্ন উপায় নিয়ে আমরা পরের একটি অধ্যায়ে আলোচনা করব।

যে কোনও গ্যালাক্সির একটা ভারী কেন্দ্র থাকে, যেখানে অবস্থান করে বেশ কয়েক কোটি তারা, এবং অবশ্যই একটি অতিভারী ব্ল্যাক হোল। ব্ল্যাক হোল সম্বন্ধে আমরা অনেক বিস্তারিতভাবে পরে আলোচনা করব, আপাতত এইটুকু বলে রাখা যাক, এরা হল ভারী তারাদের ধ্বংসাবশেষ, এবং ব্ল্যাক হোলের মহাকর্ষীয় টান এতটাই বেশি হয় যে এদের আকর্ষণ এড়াতে পারে না আলোও। তাই এদেরকে অন্ধকার দেখায়।

আমাদের মিল্কিওয়ের ছবি দেখে নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে যে বাইরের দিকে এর চারটি প্রধান বাহু বা আর্ম, যার এক একটায় রয়েছে বহু কোটি নক্ষত্র, এছাড়াও রয়েছে প্রত্যেকের একাধিক ছোট ছোট বাহুও। এই চারটি বাহুর আবার নাম রয়েছে; দুটো মেজর আর্ম বা প্রধান বাহু— Scutum-Centaurus আর Perseus, এবং দুটি মাইনর আর্ম বা অপ্রধান বাহু Norma আর Sagittarius। ২০১৩ সালে প্রায় বারো বছরের গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন। প্রধান বাহুগুলিতে থাকা তারাগুলোর বেশিরভাগই অল্পবয়সী এবং বৃদ্ধ তারা, আর অপ্রধান বাহুগুলির মাঝখানের জায়গার অধিকাংশটাই গ্যাসীয় পদার্থে ভর্তি, আর রয়েছে কিছু এমন এলাকা, যেখানে নতুন তারা তৈরি হচ্ছে। সেবারে বিজ্ঞানীরা একাধিক উন্নত টেলিস্কোপকে কাজে লাগিয়ে দেড় হাজারেরও বেশি তারার আলো বা উজ্জ্বলতা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে সেগুলো চারটি বাহু বরাবর বিন্যস্ত হয়ে রয়েছে।

এই বাহুগুলো ছাড়াও যে সমস্ত ছোট ছোট অ-গুরুত্বপূর্ণ কিছু বাহু রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটা বাহুর উপাদান-নক্ষত্রগুলোর মধ্যে একটা হল আমাদের সূর্য। এই বাহুটার যদিও নামকরণ করা হয়েছে, সূর্য এর একজন সদস্য বলেই নির্ঘাত— Orion Spur, বা Orion-Cygnus Arm। পারসিউস আর স্যাজিট্যারিয়াস বাহুর মাঝামাঝি এই বাহুটির অবস্থান। ছবি দেখলে ব্যাপারটা ভালো বোঝা যাবে—

ছবি- আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে সূর্যের অবস্থান।

 

মিল্কিওয়ে ছায়াপথের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে যেতে আলোর সময় লাগে প্রায় দেড় থেকে দু-লক্ষ বছর, আর আমাদের সূর্য রয়েছে কেন্দ্র থেকে প্রায় আঠাশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। এর মানে সূর্যের অবস্থান ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে কোনও এক প্রান্তের দিকের এক তৃতীয়াংশের মধ্যেই। এবং এই ছায়াপথের ওপর নিচের দিকে চওড়ার পরিমাণ দু-হাজার আলোকবর্ষ।

আমাদের সৌরমণ্ডল, মানে চারপাশের যাবতীয় কিছু নিয়ে সূর্য আর তার গোটা পরিবার বলতে প্রায় একসঙ্গেই ঘুরে চলেছি এই ছায়াপথের চারপাশে, আরও প্রায় তিরিশ-চল্লিশ হাজার কোটি তারার পাশাপাশি। বিরাট গতিতে ঘুরছি আমরা। সে গতি মোটেই আন্দাজ করতে পারি না। এমনিতেই আমরা সূর্যের চারপাশে ঘুরে চলেছে সেকেন্ডে প্রায় তিরিশ কিলোমিটার বা ঘণ্টায় এক লক্ষ কিলোমিটার বেগে, তার ওপর সূর্যের সঙ্গে মিলিতভাবে আরও অনেক বেশি গতিতে ঘুরছি ছায়াপথের চারপাশে। এই গতির মান ঘণ্টায় প্রায় সাড়ে আট লক্ষ কিলোমিটার।

এখানে এটাও বলে নেওয়া দরকার, সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে যে এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির আকার যেভাবে এতদিন স্পাইরাল ভাবা হত, বাস্তবে হয়তো নয় তেমনটা। প্যাঁচালো, তবে বিশেষভাবে। এর আলাদা নামও দেওয়া হয়েছে— ‘Barred spiral galaxy’। আকার অনেকটা NGC1073 নামে একটা গ্যালাক্সির মতোই। নীচে আমরা ওই গ্যালাক্সিটির ছবি দেখাচ্ছি—

ছবি- NGC 1073 গ্যালাক্সি। এর সঙ্গে আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির মিল আছে।

 

ছায়াপথের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটা অংশ হল আমাদের সূর্য। আর তার ছানাপোনাদের মধ্যে একজন মাঝারি আকারের ছানার চারপাশে ঘুরে চলেছি আমরা। আগামী পর্বে আমরা সূর্য আর তার ওই ছানাপোনাদের পরিচয় জানবার চেষ্টা করব।