বিশ্ববীণারবে/ সপ্তম পর্ব

বিশ্ববীণারবে/ সপ্তম পর্ব

চাঁদ নিয়ে কিছু কথা-১

পৃথিবীর একমাত্র স্বাভাবিক উপগ্রহ চাঁদ রয়েছে পৃথিবী থেকে তিনশো চুরাশি কিলোমিটার দূরে। সে পাক খেয়ে চলেছে পৃথিবীকে, প্রতিবার পাক খেতে সময় নেয় সাতাশ দিন। আর এই সাতাশ দিনে সে নিজের অক্ষের ওপরেও একটা গোটা পাক খায়, যে কারণে পৃথিবী থেকে চাঁদকে দেখলে সবসময় আমরা চাঁদের একটা দিকই দেখতে পাই। অন্য দিকটি পৃথিবীর ঠিক উলটো দিকে থাকে। তবে সম্প্রতি বছর দশেক আগে নাসার পাঠানো মহাকাশযান ‘লুনার রিকনিয়াসেন্স অরবিটার’ (Lunar Reconnaissance Orbiter, LRO) চাঁদের ওই দিকটাতে গিয়ে পৌঁছয় এবং ওদিকের ছবি তুলতে সক্ষম হয়।

ছবি। চাঁদের উলটো পিঠের ছবি। LRO-র তোলা ছবি।

পৃথিবীর সব চেয়ে কাছে থাকা এই মহাজাগতিক বস্তুটি পৃথিবীরই একটি অংশ, তাই বয়সও প্রায় সমান, সাড়ে চারশো কোটি বছর। পৃথিবী যখন তৈরি হয়, তখনই অন্য এক প্রকাণ্ড মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে পৃথিবীর একটা অংশ আলাদা হয়ে গিয়ে পৃথিবীরই চারপাশে ঘুরতে শুরু করে। সেটাই চাঁদ। পৃথিবী তার চেয়ে একাশি গুণ বড়। সৌরজগতে চাঁদ দ্বিতীয় উপগ্রহ, ঘনত্বের দিক থেকে। সবচেয়ে বেশি ঘনত্ব রয়েছে বৃহস্পতির উপগ্রহ ইয়ো-র।

অন্য দিকে চাঁদ থাকবার কারণেই পৃথিবী তার অক্ষের ওপরে ঘূর্ণন স্থির নির্দিষ্ট গতিতে বজায় রাখতে পারে। চাঁদের মহাকর্ষ টানের প্রভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাঁটা হয়, সেটারও কিছু বাস্তব সুবিধা তো রয়েছেই। আবার চাঁদের আকর্ষণের জন্য পৃথিবীর বার্ষিক গতিও খুব সামান্য পরিমাণে বাধাপ্রাপ্ত হয়, জানা গিয়েছে সেটাও। দেখা গিয়েছে, প্রতি একশো বছরে পৃথিবীর একটা গোটা দিন ২.৩ মিলি সেকেন্ড করে বেড়ে যায়। আর পৃথিবীকে এই টান দেওয়ার ফলে চাঁদের পৃথিবী থেকে দূরত্বও খুব আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে; প্রতি বছর প্রায় আট সেন্টিমিটার করে বেড়ে যায় এই পথের দৈর্ঘ্য।

পৃথিবীর কিছু জন্তু আছে, যারা চাঁদের প্রভাবে ঘটা এই জোয়ার ভাঁটার সময়ে তাদের প্রজননকাজ সম্পন্ন করে। চাঁদের আলোরও বেশ কিছু প্রভাব রয়েছে পশুপাখিদের ওপর। যেমন এই আলোর অনুপস্থিতিতে (অমাবস্যার সময়) বেশ কিছু প্রাণী অন্ধকারের সুযোগে শিকার ধরতে বেরিয়ে পড়ে। যেমন আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি অরণ্যের সিংহ রাতের অন্ধকারেই শিকার করে। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ওই জঙ্গলের বেশ কিছু জায়গায় নাইট-ভিশন ক্যামেরা বসিয়ে তার ছবি খতিয়ে দেখে বুঝেছেন এই সিংহের প্রিয় শিকার জঙ্গলেরই বাসিন্দা আফ্রিকান মোষ। তবে এই মোষেরাও ব্যাপারটা বুঝে নিয়েছে বলে তারা থাকে দল বেঁধে, এবং রাতের বেলা খুঁজে নেয় নিরাপদ আশ্রয়। চাঁদের বিভিন্ন দশার সঙ্গে এরা খাপ খাইয়ে নিয়েছে এদের চলাফেরাকে।

চাঁদের আলো-অন্ধকার দশার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে আফ্রিকার জঙ্গলের এক ধরনের গুবরেপোকাও। এরা চাঁদের আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের উড়ে যাওয়ার গতিপথকে বদলে নিতে পারে। সামুদ্রিক কিছু মাছের প্রজনন দেখা গিয়েছে নির্ভর করে চাঁদের আলোক-দশার ওপর। পূর্ণিমার সময় এদের প্রজনন হয় সর্বাধিক। ছোট মাছেরা বড় মাছেদের হাতে শিকার না হওয়ার জন্যেও নির্ভর করে চাঁদের আলোর ওপর। ওরা জানে, কোন দিন পূর্ণিমা হয় আর কোন দিন আকাশ থাকে অন্ধকার।

চাঁদ কী দিয়ে তৈরি?

পূর্ণিমার রাতে এখান থেকে দেখলে চাঁদকে লাগে একেবারে গোল উজ্জ্বল একটা থালার মতো। এই চাঁদের উপাদান কী সেটা জানা কঠিন কোনো কাজ না। নাসার মহাকাশযান অনেক দিন আগেই চাঁদে নেমে ওর পাথুরে ভূমি থেকে নমুনা নিয়ে এসেছিল, তা বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জেনেছিলেন যে চাঁদের মূল উপাদান কী কী। চাঁদের মোট ওজনের প্রায় তেতাল্লিশ শতাংশ অক্সিজেন, কুড়ি শতাংশ সিলিকন, উনিশ ভাগ ম্যাগনেশিয়াম, দশ ভাগ লোহা আর অল্প পরিমাণে রয়েছে টাইটানিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালশিয়াম ইত্যাদি। নাসার মহাকাশযান ইতিমধ্যে জানিয়েছে যে চাঁদের বেশ কিছু এলাকায় রয়েছে জল, এমনকি চাঁদের অভ্যন্তর-ভাগেও প্রচুর জল থাকতে পারে বলে অনুমান বিজ্ঞানীদের। কিন্তু এই জল এল কোথা থেকে? চাঁদে তো বাতাসই নেই!

অনেকে বলেন, চাঁদের মাটিতে মিশে থাকা এই সামান্য জল এসেছে চাঁদের বুকে আছড়ে পড়া উল্কা থেকে। মূলত বরফ দিয়ে তৈরি এই উল্কা খণ্ড বহু বছর ধরেই পড়ে চলেছে চাঁদের বুকে, আর ওগুলো থেকেই চাঁদে জমেছে সামান্য জলীয় উপাদান। তবে তার পরিমাণ ঠিক কতটা, তা বলা মুশকিল।

আর নিল আর্মস্ট্রং নামে এক নভশ্চর যে চাঁদের বুকে নেমেছিলেন পঞ্চাশ বছরের কিছু বেশি আগে, ১৮৬৯ সালে, এ খবর আমাদের সকলেরই জানা। আমেরিকা আর রাশিয়ার মধ্যে চলা সেই দ্বৈরথে শেষ হাসি হেসেছিল আমেরিকাই, যদিও রাশিয়াও মহাকাশযাত্রার অন্য কিছু ব্যাপারে টেক্কা দিয়েছিল আমেরিকাকে। মহাকাশযাত্রার ইতিহাস নিয়ে আমরা কিছু বিস্তারিতভাবেই আলোচনা করব পরে।

আর্মস্ট্রং-এরা যখন চাঁদে নামেন, তাঁদের পা ডুবে গিয়েছিল প্রায় দু-ইঞ্চি পুরু ধুলোর মধ্যে। চাঁদের ত্বকের বুকে (যাকে বলে রিগোলিথ, Regolith) এই ধুলো জমেছে কোটি কোটি বছর ধরে, চাঁদের চারপাশে যে বিপুল শূন্যস্থান, সেই স্থান ভরে থাকা ধূলিকণাগুলোই আস্তে আস্তে চাঁদের বুকে এসে জমতে জমতে।

এমনিতে চাঁদে নেই কোনো বায়ুমণ্ডল। বাতাস পৃথিবীকে কম্বলের মতো মুড়ে রাখে, যে কারণে আমরা সহনযোগ্য আবহাওয়ায় বেঁচে থাকতে পারি। এই বাতাসের অভাবই চাঁদের আবহাওয়াকে করে রেখেছে চরমভাবাপন্ন। চাঁদের বুকে দিনের বেলা আবহাওয়া বেশ গরম। কোনো বায়ুমণ্ডল না থাকবার জন্য দিনে এর উষ্ণতা দাঁড়ায় ১২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর রাতের বেলা (বা সূর্যের বিপরীত দিকে) থাকে ১৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

সব মিলিয়ে চাঁদ আমাদের সবচেয়ে কাছে থাকবার কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে ভারী আলোচনার বিষয়, এটা বুঝতে পারা কঠিন কিছু না। চাঁদ নিয়ে আমরা আরও কিছু কথা বলব, আগামী পর্বে।

(ক্রমশ)