বিষণ্নতা রোগের ভেগাস নার্ভ উদ্দীপনা চিকিৎসা 

বিষণ্নতা রোগের ভেগাস নার্ভ উদ্দীপনা চিকিৎসা 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ জুলাই, ২০২৬

বিষণ্নতা রোগের ভেগাস নার্ভ উদ্দীপনা চিকিৎসা

 

 

গুরুতর বিষণ্নতার মানসিক যন্ত্রণা একপ্রকার দীর্ঘস্থায়ী এক অন্ধকার বন্দিদশা। অবসাদরোধী ওষুধ, মনোচিকিৎসা, এমনকি বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ইলেকট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ECT)—সব ধরনের প্রচলিত চিকিৎসার পরও বহু রোগীর অবস্থার তেমন উন্নতি হয় না। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকেই বলা হয় চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতা । এমন রোগীদের জন্য এবার আশার আলো দেখিয়েছে ভেগাস নার্ভ স্টিমুলেশন বা ভি এন এস।

যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত বৃহৎ ক্লিনিক্যাল গবেষণা RECOVER-এর ফলাফল বলছে, শরীরে প্রতিস্থাপিত একটি ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক যন্ত্রের মাধ্যমে ভেগাস স্নায়ুকে নিয়মিত মৃদু বৈদ্যুতিক উদ্দীপনা দিলে দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতার লক্ষণ কমানো সম্ভব। গবেষকদের মতে, এটি চিকিৎসা-প্রতিরোধী বিষণ্নতার ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি হতে পারে।

ভেগাস স্নায়ু মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ুপথ। এটি মস্তিষ্কের সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস, পরিপাকতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের যোগাযোগ বজায় রাখে। ভি এন এস পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বুকের ত্বকের নীচে একটি ছোট বৈদ্যুতিক যন্ত্র বসানো হয়, যা নির্দিষ্ট সময় পরপর ভেগাস স্নায়ুতে মৃদু বৈদ্যুতিক স্পন্দন পাঠায়। এর ফলে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের আবেগ ও মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু নেটওয়ার্কের কার্যকলাপে পরিবর্তন আসে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি বহু বছর ধরেই মৃগীরোগের চিকিৎসায় সফলভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ।

RECOVER গবেষণায় অংশ নেন ৪৯৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক, যাঁদের প্রত্যেকেই অন্তত চার ধরনের প্রচলিত চিকিৎসা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন অবসাদরোধী ওষুধ, মনোচিকিৎসা এবং অনেক ক্ষেত্রে ECT গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ, গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ছিলেন এমন একদল রোগী, যাঁদের জন্য কার্যকর চিকিৎসার বিকল্প ছিল অত্যন্ত সীমিত। চিকিৎসা শুরু হওয়ার এক বছর পর থেকে গবেষণার ফলাফল গবেষকদের আশাবাদী করেছে। অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৬৯ শতাংশের ক্ষেত্রে অন্তত একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানদণ্ডে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। শুধু বিষণ্নতার উপসর্গই নয়, তাঁদের জীবনমান, দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতা এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতারও উন্নতি হয়েছে। সবচেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক দিক হলো, যাঁরা প্রথম বছরে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন, তাঁদের ৮০ শতাংশেরও বেশি দ্বিতীয় বছরেও সেই উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হন। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল—যাঁদের শুরুতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি, তাঁদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে উন্নতি করতে শুরু করেন। অর্থাৎ, ভি এন এস তাৎক্ষণিক ফল না দিলেও এর প্রভাব সময়ের সঙ্গে ক্রমশ শক্তিশালী হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফল দিতে পারে।

গবেষকদের মতে, ভি এন এস -এর কার্যপদ্ধতি প্রচলিত দ্রুত-কার্যকর অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটি হঠাৎ করে মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্য পরিবর্তন করে না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে মেজাজ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু বর্তনীকে পুনর্গঠিত ও সুসংগঠিত করে। ফলে রোগীর মানসিক অবস্থায় ধীরে ধীরে স্থিতিশীল এবং দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

নিরাপত্তার দিক থেকেও প্রযুক্তিটি আশাব্যঞ্জক। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াই ছিল মৃদু ও সাময়িক—যেমন কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে যাওয়া, উদ্দীপনার সময় সামান্য শ্বাসকষ্ট বা গলায় অস্বস্তি। তেমন গুরুতর কোনো জটিলতা ছিল না বললেই চলে।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ বিষণ্নতায় আক্রান্ত, আর তাঁদের বেশির ভাগই প্রচলিত চিকিৎসায় পর্যাপ্ত উপকার পান না। RECOVER গবেষণার ফলাফল একটি নতুন চিকিৎসা প্রযুক্তির সাফল্য তো বটেই। সেই সঙ্গে এটি সেইসব মানুষের জন্য নতুন আশার বার্তা, যাঁদের কাছে এতদিন কার্যকর চিকিৎসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে, ভেগাস নার্ভ স্টিমুলেশন গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতার চিকিৎসায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।

 

সূত্র: ScienceAlert article on the RECOVER trial results, published in the International Journal of Neuropsychopharmacology.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 × 1 =