হৃদযন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন বা কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে ভোগায়। বর্তমানে এর চিকিৎসা প্রধানত পেসমেকার বসানো। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শরীরে পেসমেকার বসানো হয়। কিন্তু তাতে সংক্রমণ ও টিস্যুর ক্ষতি প্রভৃতি ঝুঁকি থাকে। এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) এবং ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার (ইউএসসি)-এর গবেষকরা বিনা অস্ত্রোপচারে (নন-ইনভেসিভ) লাগানো যায় এমন একটি আল্ট্রাসাউন্ড পেসমেকার তৈরি করেছেন, যা বুকের উপর স্টিকারের মতো লাগানো যায়। এটি আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গের মাধ্যমে হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই প্রযুক্তির ভিত্তি হল ‘সোনোজেনেটিক্স’। এতে হৃদপেশির কোষকে জেনেটিকভাবে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যাতে তারা আল্ট্রাসাউন্ডের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। পরীক্ষাগারে দেখা গেছে, জিন-পরিবর্তিত মানব হৃদপেশির প্রায় ৭৫ শতাংশ কোষ আল্ট্রাসাউন্ডের ছন্দ অনুযায়ী স্পন্দিত হতে পারে। অথচ অপরিবর্তিত কোষে এমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একই সঙ্গে, এই প্রক্রিয়ায় কোষের কোনো উল্লেখযোগ্য ক্ষতি বা প্রদাহের লক্ষণও পাওয়া যায়নি। পরে ডাকটিকিট আকারের একটি পরিধানযোগ্য সহজসাধ্য আল্ট্রাসাউন্ড পেসমেকার (এনইউপি) তৈরি করেন। ৬৪-চ্যানেলের আল্ট্রাসাউন্ড ট্রান্সডিউসার, বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ব্যাটারিযুক্ত এই যন্ত্রটি জিন-পরিবর্তিত ইঁদুরের ওপর সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। আল্ট্রাসাউন্ড প্রয়োগ করে তাদের হৃদস্পন্দন প্রতি মিনিটে ২৪০ থেকে বাড়িয়ে ৩৬০-৫৪০ পর্যন্ত করা সম্ভব হয়েছে। উদ্দীপনা বন্ধ হলে হৃদস্পন্দন আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। এই পেসমেকার এক মিলিমিটারেরও কম নির্ভুলতায় হৃদপিণ্ডের নির্দিষ্ট অংশকে নিশানা করতে পারে। এটি কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট অ্যারিদমিয়াও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম। ভবিষ্যতে মানুষের জন্য এই প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করবে। শূকরের হৃদপিণ্ডের ওপর পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, শরীরের টিস্যু ভেদ করে পর্যাপ্ত শক্তির আল্ট্রাসাউন্ড হৃদপিণ্ডে পৌঁছানো সম্ভব। গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই পরিধানযোগ্য আল্ট্রাসাউন্ড পেসমেকার হয়তো প্রচলিত অস্ত্রোপচারভিত্তিক পেসমেকারের কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠবে। হৃদরোগের পাশাপাশি অন্যান্য রোগের চিকিৎসাতেও এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
সূত্র: Physics World ; July ; 2026
