বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ডানহাতি। দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ কাজ, যেমন লেখালেখি, খাওয়া, বল ছোড়া কিংবা যন্ত্রপাতি ব্যবহারে তারা ডান হাত ব্যবহার করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, কেন মানুষের মধ্যে ডানহাতির সংখ্যা এত বেশি? সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মানুষের ডানহাতি হয়ে ওঠার পেছনে দুটি বড় বিবর্তনীয় পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমটি হল, দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটার ক্ষমতা বা দ্বিপদ গমন (বাইপেডালিজম), আর দ্বিতীয়টি হল, মস্তিষ্কের আকার ও জটিলতার বৃদ্ধি। মানুষের পূর্বপুরুষেরা যখন লক্ষ লক্ষ বছর আগে চার পায়ে চলাফেরা ছেড়ে দু-পায়ে হাঁটা শুরু করল, তখন তাদের হাত নতুন ধরনের কাজের জন্য মুক্ত হয়ে যায়। অন্যান্য অনেক প্রাইমেটের মতো তাদের হাত আর চলাফেরার প্রধান উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হতো না। ফলে বস্তু বহন, ইশারা করা, খাবার সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম পরিচালনার মতো কাজে হাত ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এই পরিবর্তনের ফলেই এক হাতকে অন্য হাতের তুলনায় বেশি দক্ষভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা বাড়তে থাকে। কোনো একটি হাতকে সূক্ষ্ম ও নির্ভুল কাজের জন্য নিয়মিত ব্যবহার করলে কাজের গতি ও দক্ষতা বাড়ে। ধীরে ধীরে এই সুবিধা বিবর্তনীয় নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, মানব মস্তিষ্কের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর বিভিন্ন অংশ বিশেষায়িত হতে শুরু করে। বিশেষ করে মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ ধীরে ধীরে ভাষা, সূক্ষ্ম চলন দক্ষতা এবং ধারাবাহিকভাবে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হল। যেহেতু মস্তিষ্কের বাম অংশ শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে, তাই ডান হাত ব্যবহারের প্রবণতাও আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা জানান, মানুষের এই ডানহাতি প্রবণতা শুধু আধুনিক সমাজে নয়, প্রাচীন মানবগোষ্ঠীর মধ্যেও দেখা যায়। নিয়ান্ডারথাল সহ বহু বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির ব্যবহৃত পাথরের সরঞ্জাম এবং দাঁতের ক্ষয়চিহ্ন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ডান হাতের প্রাধান্যের প্রমাণ পেয়েছেন। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর ধরেই মানুষের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হতে গবেষকেরা দু হাজারের বেশি প্রাইমেটের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন। দেখা গেছে, শিম্পাঞ্জি, গরিলা কিংবা ওরাংওটানের মধ্যেও হাত ব্যবহারের কিছু পছন্দ রয়েছে, তবে তা মানুষের মতো এতটা স্পষ্ট নয়। বেশিরভাগ প্রাইমেটের ক্ষেত্রে ডান ও বাম হাত ব্যবহারের মধ্যে তুলনামূলক ভারসাম্য দেখা যায়। এই ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ প্রাইমেটদের মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী প্রজাতি। সোজা হয়ে হাঁটার ক্ষমতা এবং বড় ও জটিল মস্তিষ্কের সমন্বয় মানুষের মধ্যে শক্তিশালী ডানহাতি প্রবণতা গড়ে তুলেছে। গবেষকদের মতে, ডানহাতি হওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং এটি দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার ফল, যা মানুষের বেঁচে থাকা, দক্ষতার সঙ্গে কাজ করা এবং জটিল সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের এই যৌথ বিবর্তনই আজকের পৃথিবীতে ডানহাতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অন্যতম প্রধান কারণ।
সূত্র : Science Acumen ; June ; 2026
