মনশ্চক্ষে দেখা মানে কী? 

মনশ্চক্ষে দেখা মানে কী? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

আমরা চোখ বন্ধ করলেই অতীতের অনেক দৃশ্য কল্পনা করতে পারি । শৈশবের প্রিয় খেলনা, প্রথম প্রেমিকের মুখ, জীবনের সবচেয়ে বিব্রত মুহূর্ত—এগুলো সবই মনের ক্যানভাসে জ্বলজ্বল করে ফুটে ওঠে। এবার কথা হল যখন আমরা মনের চোখে কোনো ছবি কল্পনা করি, তখন মস্তিষ্কে আসলে কী ঘটে? সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণা বলছে, এই প্রক্রিয়ায় সেই সেই নিউরনগুলোই কাজ করে, যেগুলো দিয়ে আমরা বাস্তবে সেই জিনিসগুলো দেখেছিলাম।

আমাদের কল্পনাশক্তির ভেতরের কাজ বোঝার জন্য, সিডারস সিনাই মেডিকাল সেন্টারের স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এমন কিছু মৃগী রোগীর ওপর গবেষণা চালান, যাদের মস্তিষ্কে আগেই খিঁচুনির কারণ নির্ণয়ের জন্য তড়িৎদ্বার বসানো ছিল। তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে বিভিন্ন মুখ ও বস্তু দেখান, এবং পরে সেগুলো মনে মনে কল্পনা করতে বলেন। এই পুরো সময়ে শত শত নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ রেকর্ড করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ছবি দেখার সময় মস্তিষ্কের ফিউসিফর্ম গাইরাস (ভাঁজ) সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটি মস্তিষ্কের টেম্পোরাল ও অক্সিপিটাল লোবের অংশ। এর কাজ হল উচ্চস্তরের দৃশ্য প্রক্রিয়াকরণ। গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, প্রায় ৮০ শতাংশ নিউরন ছবির নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের প্রতি প্রতিক্রিয়া জানায়, যার ফলে খুব সহজেই তাদের নিউরাল কোড বোঝা গেছে।

এরপর যখন অংশগ্রহণকারীদের সেই ছবিগুলো মনে মনে কল্পনা করতে বলা হয়, তখন দেখা যায়, ওগুলির মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ নিউরন আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং একই কোড ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, আমরা কিছু দেখার সময় যেসব নিউরন কাজ করে , সেই একই নিউরনদের সাহায্যেই আমরা পরে সেটি মনে করতে পারি বা কল্পনা করতে পারি।

গবেষণা পত্রের সহ-লেখক উয়েলি রুটিশাউজার বলেন, “আমরা আগে দেখা কোনো বস্তুর মানসিক ছবি তৈরি করি সেই একই মস্তিষ্ক কোষগুলোকে আবার সক্রিয় করে তুলে, যেগুলো দিয়ে আমরা সেটি প্রথমে দেখেছিলাম। আমাদের গবেষণায় আমরা সেই কোডটি খুঁজে পেয়েছি, যেটা দিয়ে আমরা ছবিগুলো পুনর্গঠন করি।” কিন্তু এই জটিল “নিউরাল কোড” তারা কীভাবে বুঝলেন? তাঁরা অকপটে স্বীকার করেছেন এক্ষেত্রে তাদের পথ দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

সহ-লেখক বরুণ ওয়াদিয়া ব্যাখ্যা করেছেন, “আমরা ডিপ ভিজ্যুয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বস্তুর সংখ্যাগত বর্ণনা তৈরি করেছি, যাতে নিউরনের কোড বোঝা যায়। এরপর জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন ছবি তৈরি করে আমরা সেই কোড যাচাই করেছি, মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার সঠিক পূর্বাভাসও দিতে পেরেছি।”

গবেষকেরা মনে করেন, এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে এমন সব মানসিক রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করতে পারে, যেখানে অতিরিক্ত মানসিক কল্পনা সমস্যা তৈরি করে। যেমন উদ্বেগ আশঙ্কা , স্কিজোফ্রেনিয়া, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)। কে জানে, একদিন হয়তো এই প্রযুক্তি আমাদের সেইসব বিরক্তিকর বা লজ্জাজনক স্মৃতিগুলো মুছে দিতে পারবে, যেগুলো আমাদের কাছে দুঃস্বপ্ন।

সূত্র: Nautilus Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen + three =