মনের সুরের কৃত্রিম স্বরলিপি

মনের সুরের কৃত্রিম স্বরলিপি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৩ আগষ্ট, ২০২৬

মনে মনে গান গাইছেন। গলায় কোনও শব্দ নেই। তবু আপনার মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ করে সেই সুরের ওঠানামা বুঝে নিতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষকদের এক নতুন গবেষণা এমনই এক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে এটি কথা বলতে অক্ষম রোগীদের যোগাযোগের নতুন মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষক জি কওন ও চুন কি চুংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণার বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে eNeuro পত্রিকাতে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেতে এমন তথ্য লুকিয়ে থাকে, যা বিশ্লেষণ করে মনে মনে কল্পনা করা সুরের পর্দা বা স্বরের ক্রম শনাক্ত করা সম্ভব। গবেষণায় অংশ নেন মৃগীরোগে আক্রান্ত ১০ জন রোগী। চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁদের মস্তিষ্কের পৃষ্ঠে আগে থেকেই তড়িৎদ্বার (ইলেক্ট্রোড) বসানো ছিল। গবেষকরা প্রথমে অংশগ্রহণকারীদের পরিচিত শিশুগীতির কয়েকটি লাইন শোনান। তারপর তাঁদের গানটির পরের অংশ মনে মনে কল্পনা করতে বলা হয়। শেষে রোগীরা সেই সুর গুনগুন করে শোনান, যাতে গবেষকরা কল্পিত সুরের সঙ্গে বাস্তব গানের মিল যাচাই করতে পারেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, মস্তিষ্কের সংকেত থেকে প্রতিটি নোটের আপেক্ষিক স্বরস্থান বা রিলেটিভ পিচ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সেই তথ্য ধারাবাহিকভাবে একত্র করে গবেষকরা কল্পিত গানের সম্পূর্ণ সুরের গতিপথ ও ওঠানামা পুনর্গঠন করতে সক্ষম হন। অ্যালগরিদমটি কোনও একটি নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক বা অ্যাবসোলিউট স্বরস্থান শনাক্ত করেনি। বরং এটি সা, রে,গা,মা, পা-র মতো আপেক্ষিক স্বরস্থানগুলির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছে। কারণ মানুষ সাধারণত কোনও গানকে তার নির্দিষ্ট স্বরস্থানের উচ্চতা দিয়ে চেনে না, চেনে স্বরগুলির পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে। তাই একই সুর ভিন্ন স্কেলে বাজানো হলেও সেটি আমাদের পরিচিতই মনে হয়। গবেষকদের তৈরি মডেলও মানুষের এই স্বাভাবিক সঙ্গীত-অনুভূতিকেই অনুসরণ করেছে। এই ফলাফল প্রমাণ করে যে মানুষের কল্পনায় বাজতে থাকা সুরও মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করে শুধু সুর নয়, সঙ্গীতের গতি, ছন্দ, তীব্রতা এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি শিশুদের পরিচিত গানের বাইরে জটিল সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। তবে গবেষণাটির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (ALS)-এর মতো মোটর নিউরন রোগে যাঁরা আক্রান্ত, যাঁরা কথা বলতে অক্ষম, ভবিষ্যতে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসের মাধ্যমে তাঁরা তাঁদের মনের ভাব বা কল্পিত সুর সরাসরি মস্তিষ্কের সংকেতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে পারবেন। শুধু যোগাযোগই নয়, নিজের মনে গুনগুনিয়ে ওঠা সঙ্গীতও একদিন হয়তো বাস্তবে শোনা যাবে। যদিও প্রযুক্তিটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং মাত্র ১০ জন অংশগ্রহণকারীর উপরই এর পরীক্ষা হয়েছে, তবু গবেষকরা মনে করছেন, এটি মানুষের মনের সুর পড়ে ফেলার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণা সফল হলে মস্তিষ্কের ভাষা বোঝা এবং শব্দ বা সঙ্গীতে তার রূপান্তরণ হবে খুব সহজ।

 

সূত্র: NeuroScience; Aug ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two − 1 =