মস্তিষ্ককে শুধু অসংখ্য নিউরন ও তাদের সংযোগে তৈরি একটি ‘বর্তনী’ হিসেবে দেখলে তার কাজের পুরোটা বোঝা যায় না। মস্তিষ্কের ছন্দোময় বৈদ্যুতিক তরঙ্গই স্মৃতি, চিন্তা ও চেতনাকে দ্রুত সমন্বিত করার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক হতে পারে। এমআইটির অধ্যাপক আর্ল কে. মিলার, গবেষক স্কট এল. ব্রিনক্যাট ও জেফারসন ই. রয়-এর নতুন গবেষণায় এমনই তত্ত্ব উঠে এসেছে। মস্তিষ্কের একটি নিউরন একই সঙ্গে একাধিক কাজ ও নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকতে পারে। এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় ‘মিশ্র নির্বাচনশীলতা’। ফলে পরিস্থিতি অনুযায়ী একই নিউরন ভিন্ন তথ্য প্রক্রিয়াকরণে অংশ নিতে পারে। এত দ্রুত এই বিপুল সংখ্যক নিউরনের সমন্বয়ের কাজ শুধু সিন্যাপ্সের ওপর নির্ভর করে করা যায় না। কারণ সিন্যাপ্সের রাসায়নিক পরিবর্তন অপেক্ষাকৃত ধীর। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ। ধীরগতির আলফা ও বিটা তরঙ্গ স্মৃতি, লক্ষ্য ও পূর্বজ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করে, আর দ্রুতগতির গামা তরঙ্গ বাইরের জগত থেকে আসা তথ্য প্রক্রিয়াকরণে সাহায্য করে। অর্থাৎ, কোন নিউরন কখন এবং কোথায় সক্রিয় হবে, তরঙ্গ তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই তরঙ্গগুলো মস্তিষ্কের কর্টেক্সের ওপর দিয়ে চলাচলও করে। ফলে একই সঙ্গে স্থান ও সময়ের ভিত্তিতে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ সম্ভব হয়। গবেষকেরা একে বলছেন ‘স্থান-কালনির্ভর’ বা স্পেশিওটেম্পোরাল কম্পিউটিং। তরঙ্গের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় যোগ-বিয়োগের মতো প্রক্রিয়াও ঘটতে পারে, যা অ্যানালগ কম্পিউটেশনের সঙ্গে তুলনীয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিউরনের কার্যকলাপ থেকে তৈরি বৈদ্যুতিক তরঙ্গ আবার বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে নিউরনের কার্যকলাপকেই দ্রুত প্রভাবিত করতে পারে। ফলে মস্তিষ্কে তথ্য সমন্বয়ের একটি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি হয়। এই তরঙ্গগুলো যখন মস্তিষ্কের বিস্তৃত অঞ্চলকে একটি সুসংগঠিত অবস্থায় নিয়ে আসে, তখনই চেতনা ও বুদ্ধিজাত জ্ঞান তৈরি হতে পারে। অ্যানেস্থেশিয়া নিয়ে গবেষণাতেও দেখা গেছে, ভিন্ন ধরনের ওষুধ মস্তিষ্কের তরঙ্গের সমন্বয় ব্যাহত করে অচেতনতা সৃষ্টি করতে পারে। তবে এটি এখনও একটি তত্ত্ব প্রস্তাব। মস্তিষ্ক সত্যিই এভাবে অ্যানালগ গণনা করে কি না, তা সরাসরি প্রমাণ করতে আরও গবেষণা দরকার। ভবিষ্যতে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক তরঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে শল্যহীন চিকিৎসা তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক শুধু নিউরনের একটি বর্তনী নয়, সে হয়তো নিজের বৈদ্যুতিক তরঙ্গকে কাজে লাগানো একটি অত্যন্ত দক্ষ জৈবিক কম্পিউটার।
সূত্র: Miller, E. K., et al. (2026). Analog Cognition and Consciousness. Journal of Neuroscience. DOI: 10.1523/JNEUROSCI.0711-26.2026. https:// www. jneurosci. org / content/46/33/e0711262026
