মহাকাশে ব্যবহৃত কলম

মহাকাশে ব্যবহৃত কলম

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৫ জুলাই, ২০২৬

একটি গল্প বহুদিন ধরেই প্রচলিত। মহাকাশে গিয়ে লেখবার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নাকি কোটি কোটি ডলার খরচ করে বিশেষ কলম তৈরি করেছিল। আর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের মহাকাশচারীদের হাতে শুধু একটি সাধারণ পেন্সিল তুলে দিয়েছিল। তবে আসল ইতিহাস আরও বেশি চমকপ্রদ। সম্প্রতি নিউইয়র্কের একটি নিলামে ১৯৬৯ সালের ডুরো রকেট নামে একটি কলম বিক্রি হয়েছে সাড়ে আট লাখ ডলারেরও বেশি দামে। কলমটি অ্যাপোলো-১১ চন্দ্র অভিযানের মহাকাশচারী বাজ অলড্রিনের ব্যবহৃত। চাঁদে যাওয়ার সময় তিনি এই সাধারণ ফেল্ট-টিপ কলমটি সঙ্গে নিয়েছিলেন। কলমটির এই মূল্য কিন্তু শুধু ঐতিহাসিক স্মৃতির জন্য নয়। এটি একসময় দুই মহাকাশচারীর প্রাণ বাঁচিয়েছিল। চাঁদের মাটিতে প্রথম পদচারণা শেষে বাজ অলড্রিন ও নিল আর্মস্ট্রং যখন লুনার মডিউল ঈগল-এ ফিরে আসেন, তখন দেখা যায় ইঞ্জিন চালুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সার্কিট ব্রেকারের সুইচ ভেঙে মেঝেতে পড়ে রয়েছে। ওই সুইচ ছাড়া ইঞ্জিন চালু করা সম্ভব ছিল না। ফলে চাঁদ থেকে উড়ে কমান্ড মডিউলে থাকা মাইকেল কলিন্সের সঙ্গে মিলিত হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যায়। হিউস্টনে নাসার মিশন কন্ট্রোলের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো বিকল্প সমাধান পাওয়া যায়নি। তখন অলড্রিন নিজের স্পেসস্যুটের পকেট থেকে অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সেই সাধারণ কলমটি বের করেন। কলমের মাথা দিয়ে তিনি ভাঙা সার্কিট ব্রেকারের জায়গায় চাপ দেন। কিছুক্ষণ উৎকণ্ঠার পর দেখা যায়, সেটিই অস্থায়ী সুইচের কাজ করছে। ইঞ্জিন চালু হয় এবং দুই মহাকাশচারী নিরাপদে চাঁদ ছেড়ে ফিরে আসতে সক্ষম হন। যে কলমটি আজ লাখ লাখ ডলারে বিক্রি হয়েছে, সেটির দাম ১৯৬০-এর দশকে ছিল এক ডলারেরও কম। অ্যাপোলো-১১-এর আগে নাসা মহাকাশে লেখার জন্য আরও উন্নত প্রযুক্তির কলম ব্যবহার শুরু করেছিল। ১৯৬৮ সালে অ্যাপোলো-৭ অভিযানের জন্য সংস্থাটি ফিশার এজি-৭ স্পেস পেন কিনেছিল। প্রতিটি কলমের দাম ছিল মাত্র ৬ ডলার। একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নও তাদের সয়ুজ মহাকাশযানের মহাকাশচারীদের জন্য ১০০টি ফিশার স্পেস পেন এবং ১,০০০টি কালি কার্টিজ কিনেছিল। কলমগুলির ভিতরে নাইট্রোজেন গ্যাসের চাপ ব্যবহার করা হয়। ফলে মহাকর্ষ না থাকলেও কালি সহজেই কলমের নিবে পৌঁছে যায় এবং শূন্য মাধ্যাকর্ষণেও লেখা সম্ভব হয়। বিশেষ স্পেস পেন আসার আগে নাসা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন, উভয়েই পেন্সিল-ই ব্যবহার করত। সোভিয়েতরা গ্রিজ পেন্সিল ব্যবহার করলেও নাসার জেমিনি অভিযানে ব্যবহৃত হতো বিশেষ ধরনের মেকানিক্যাল পেন্সিল। তবে এগুলোর দামও কম ছিল না। প্রতিটি পেন্সিলের মূল্য ছিল প্রায় ১২৯ ডলার। নাসা মোট ৩৪টি পেন্সিল কিনেছিল, যার মোট খরচ দাঁড়ায় ৪,৩৮২.৫০ ডলার। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনার মুখে পড়ে সংস্থাটি। পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণেও পেন্সিলের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ ছিল। ভাঙা পেন্সিলের নিব বা গ্রাফাইটের ছোট কণা মহাকাশযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারত। এছাড়া কাঠের পেন্সিল দাহ্য হওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিও ছিল। অ্যাপোলো-১ পরীক্ষামূলক অভিযানে অগ্নিকাণ্ডে তিন মহাকাশচারীর মৃত্যুর পর নাসা এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে আরও সতর্ক হয়ে ওঠে। বর্তমানেও আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনসহ বিভিন্ন মহাকাশ মিশনে মহাকাশচারীরা ফিশার স্পেস পেন ব্যবহার করেন। প্রতিষ্ঠানটি এখন প্রায় ৮০ ধরনের স্পেস পেন তৈরি করে। এর মধ্যে অ্যাপোলো-১১-এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংস্করণ এবং নাসার আর্টেমিস কর্মসূচিকে স্মরণ করে তৈরি মডেলও রয়েছে।

সূত্র: Nautilus; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − nineteen =