মাইক্রোকম্ব প্রযুক্তিতে তৈরি রংধনু চিপ 

মাইক্রোকম্ব প্রযুক্তিতে তৈরি রংধনু চিপ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লাফবরো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা চালের দানার মতো ছোট একটি মাইক্রোচিপ তৈরি করেছেন। এটি আলোকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সাজিয়ে রংধনুর ন্যয় সাতরঙা একটি আলোক বর্ণালী তৈরি করতে পারে। এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের দ্রুতগতির ও বেশি তথ্য বহনকারী 6G যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি রেডার, জ্যোতির্বিজ্ঞান, দিকনির্দেশনা এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতেও কাজে লাগতে পারে। এই গবেষণাটির বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে নেচার কমিউনেকেশান্স জার্নালে।

চিপটি যে প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি হয়েছে তার নাম মাইক্রোকম্ব। এতে বিভিন্ন কম্পাঙ্কের আলো নির্দিষ্ট দূরত্বে পরপর সাজানো থাকে, অনেকটা চিরুনির দাঁতের মতো। সাধারণত মানুষ চোখে এই আলো দেখতে পায় না। বিশেষ অ্যান্টেনার মাধ্যমে এই আলোক-কম্পাঙ্কগুলোকে উচ্চ-কম্পাঙ্কের মিলিমিটার তরঙ্গে রূপান্তরিত করা যায়। একই সঙ্গে একাধিক মিলিমিটার-তরঙ্গ তৈরি হওয়ায় ভবিষ্যতে একই সময়ে বিভিন্ন চ্যানেলে বিপুল পরিমাণ তথ্য পাঠানো সম্ভব হতে পারে।

6G প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যতের যোগাযোগব্যবস্থায় আরও দ্রুতগতিতে এবং উচ্চ রেজোলিউশানের বিপুল তথ্য আদান-প্রদান করা প্রয়োজন হবে। মিলিমিটার তরঙ্গ তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যান্ডউইথ বা তথ্য বহনের সুযোগ দেয়। তবে এত উচ্চ কম্পাঙ্ক তৈরি করার ক্ষেত্রে নির্ভুলতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এত দিন খুবই কঠিন ছিল।

নতুন এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সেই সমস্যার সমাধানের পথ দেখিয়েছেন। প্রচলিত ব্যবস্থায় লেজার আলো একটি ক্ষুদ্র মাইক্রোরেজোনেটরের মধ্যে ঘুরতে থাকে। নতুন এই ব্যবস্থায় চিপের মাইক্রোরেজোনেটরের সঙ্গে একটি বড় অপটিক্যাল ফাইবার-লুপ যুক্ত করা হয়েছে। আলো বারবার এই দুই অংশের মধ্য দিয়ে চলাচল করায় কাঙ্ক্ষিত আলোক-দশা তৈরি হয় এবং দীর্ঘ সময় সেটি স্থিতিশীল থাকে। এমনকি আশপাশে নড়াচড়া বা কম্পন হলেও মাইক্রোকম্বের স্থিতিশীলতা অটুট থাকে।

এছাড়াও গবেষকরা দেখিয়েছেন, রংধনুর প্রতিটি আলোক-কম্পাঙ্ককে আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অর্থাৎ কোনোটিকে শক্তিশালী, আবার কোনোটিকে দুর্বল করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আলোকে মিলিমিটার তরঙ্গে রূপান্তর করার পরও তার নির্ভুলতা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

এই প্রযুক্তি শুধু যোগাযোগের জন্য নয়, অত্যন্ত নির্ভুল সংকেত তৈরি করতে পারায় একে অন্য নানা কাজে লাগানো যাবে। যেমন রেডার, স্পেকট্রোস্কপি, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ এবং কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ। বিশেষ করে কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে অতি নির্ভুল সময় গণনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এখনো পুরো ব্যবস্থাটি একটি টেবিলের ওপর বসানোর মতো বড়। গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এর আকার, শক্তি খরচ ও ওজন আরও কমানো। ভবিষ্যতে পুরো ব্যবস্থাটি জুতার বাক্সের মতো ছোট করা গেলে উপগ্রহেও এটিকে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। চালের দানার সমান এই ক্ষুদ্র রংধনু চিপ ভবিষ্যতের দ্রুত যোগাযোগ ও অতি-নির্ভুল প্রযুক্তির জন্য বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে চলেছে।

সূত্র: “Millimetre-wave comb generated by an optical microcomb” by L. Peters, A. Cutrona, et.al; 20th August 2026, published in Nature Communications.

DOI: 10.1038/s41467-026-76747-2

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × four =