বর্তমানে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ একাধিক বিপজ্জনক হুমকির মুখে। তার মধ্যেও সবচেয়ে বিপজ্জনক দুটি হল- পারমাণবিক যুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অপব্যবহার। এই দুইয়ের আগ্রাসনে আগামী ২১০০ সালের মধ্যে মানবজাতির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। দ্য ল্যানসেট কমিশন অন টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি গ্লোবাল থ্রেটস টু হেলথ-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। আগামী ৭৫ বছরে বিশ্বস্বাস্থ্যের জন্য চিহ্নিত ১৭টি পরস্পর-সম্পর্কিত বিপদের মধ্যে এই দুটি হুমকিকে বিশেষভাবে গুরুতর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি কেবল বিস্ফোরণ, প্রাণহানি ও তেজস্ক্রিয় দূষণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যাপক পারমাণবিক সংঘাতের ফলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া, ছাই ও সূক্ষ্ম কণা বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে সূর্যের আলো পৃথিবীর পৃষ্ঠে কম পৌঁছাবে এবং বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা হ্রাস পাবে । এই পরিস্থিতিকে বলা হয় নিউক্লিয়ার উইন্টার।
সূর্যালোকের অভাবে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। ফসলের ফলন কমে যাওয়া, খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং ব্যাপক দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এর পরিণতিতে বিশ্ব অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিপর্যস্ত হতে পারে। চরম পরিস্থিতিতে মানবসভ্যতার টিকে থাকাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতিকর কাজে ব্যবহার করা হলে নতুন ধরনের জৈব অস্ত্র তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এআইয়ের সাহায্যে বিপজ্জনক জীবাণুর নকশা বানানো কিংবা তাদের বিস্তার ঘটানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে মানবস্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। এমন বিপর্যয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কমিশনের মতে, এই দুটি হুমকিকে অন্যান্য বৈশ্বিক সমস্যার থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। জলবায়ু পরিবর্তন, শিশুদের অপুষ্টি, বায়ুদূষণ, স্থূলতা, জীবাণু বিরোধী প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক মহামারি এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক সহায়তা হ্রাস, এ সবই মানুষের সুস্থতা ও বেঁচে থাকার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একটি সংকট অন্য সংকটকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে। ফলে রোগ, অকালমৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার সম্মিলিত বোঝা বিপুল পরিমাণে বাড়তে পারে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়তে পারে দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও সীমিত সম্পদের দেশগুলির ওপর।
তবে এই বিপদগুলি অনিবার্য নয়। সমন্বিত সরকারি নীতি, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই পরমাণু সংঘাত প্রতিরোধ, এআইয়ের অপব্যবহার রোধ এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
কমিশনের তরফ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে—আজ সরকার, অর্থদাতা সংস্থা ও শিল্পক্ষেত্র যে সিদ্ধান্ত নেবে, তার ওপরই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা অনেকাংশে নির্ভর করবে। সময় থাকতে পদক্ষেপ না নিলে আগামী দিনের সংকট আরও গভীর ও নিয়ন্ত্রণাতীত হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: The Lancet Commission on 21st Century Global Threats to Health (2026).
