একসময় কিছু দৃশ্য নিছক কল্পবিজ্ঞান হিসেবে দেখা হতো। যেমন ফুটপাতে মানুষের ভিড়, কিন্তু তাদের অধিকাংশই মানুষ নয়, মানবাকৃতির রোবট। কেউ কফি হাতে অফিসে যাচ্ছে, কেউ মোবাইল ফোনে ব্যস্ত, কেউ আবার নিজের যান্ত্রিক পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটছে। আর রাস্তার এক কোণে বসে আছে একজন বেকার মানুষ, সাহায্যের আশায় বাড়িয়ে রেখেছে হাত। আজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের অগ্রগতির কারণে সেই কল্পনা অনেকের কাছে বাস্তব ভবিষ্যতের পূর্বাভাস বলে মনে হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এখন একটি প্রশ্নই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে , মানবাকৃতির রোবটই কি একদিন মানুষের সব কাজ করে দেবে? AI-নির্ভর প্রযুক্তির উত্থান, স্বয়ংক্রিয় কারখানা, এবং মানুষের মতো দেখতে ও চলাফেরা করতে সক্ষম নতুন প্রজন্মের রোবট এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে তুলেছে। কিন্তু যারা এই প্রযুক্তি তৈরি করছেন, সেই রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞদের অনেকেই মনে করেন, এই ভয় বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি অতিরঞ্জিত।
সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স সম্মেলনে হাজার হাজার বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ একত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে একটি বিতর্কের বিষয় ছিল: “২০৫০ সালের মধ্যে কি মানবাকৃতি রোবট অধিকাংশ মানবশ্রমকে প্রতিস্থাপন করবে?” উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উত্তর আসে—না। বিতর্ক শেষে এই মতামত আরও জোরালো হয়। অর্থাৎ, যাঁরা রোবট প্রযুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি চর্চা করছেন, তাঁরাই মনে করেন মানুষের কর্মজীবনের অবসান এখনো অনেক দূরের ব্যাপার।
এই মতের অন্যতম প্রবক্তা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কেনেথ গোল্ডবার্গ। তাঁর মতে, সাধারণ মানুষ রোবটের যে ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হন, তার অনেকটাই প্রদর্শনমূলক। একটি রোবট যদি নিখুঁতভাবে ডিগবাজি দিতে পারে, ম্যারাথনে অংশ নিতে পারে বা শত শত রোবট যদি একসঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে প্রযুক্তিগত সাফল্য। কিন্তু এসব দক্ষতা মানুষের কাজের প্রকৃত চ্যালেঞ্জের তুলনায় কিচ্ছু না, অনেক সহজ।
কারণ, মানুষের কাজের আসল শক্তি তো শুধু হাঁটা, দৌড়ানো বা ভারসাম্য রক্ষা নয়। বরং পরিবেশ বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোনো জড় বস্তুকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করা এবং অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, এগুলোই তো মানুষের বৈশিষ্ট্য। একটি শিশু অনায়াসে জুতোর ফিতা বাঁধতে পারে, একটি কাপ সাবধানে তুলে রাখতে পারে, কিংবা রান্নাঘরে সবজি কাটতে পারে। অথচ এই সাধারণ কাজগুলোই আজকের এতো উন্নত রোবটের দুঃসাধ্য।
মানুষের হাতই তো প্রকৃতির এক বিস্ময়কর প্রকৌশল। হাতের কাজ শুধু শক্তিশালী নয়, অবিশ্বাস্যরকম সূক্ষ্মও। একটি ডিম না ভেঙে হাতে তুলে নেওয়া কিংবা একটি সূচে সুতা পরানোর মতো কাজ মানুষের কাছে স্বাভাবিক হলেও রোবটের কাছে এখনও এটা বিশাল প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। ফলে কৃষিকাজ, নির্মাণশিল্প, কলকব্জা সারাই, বৈদ্যুতিক মেরামতি, গাড়ি সারাই, নার্সিং কিংবা বয়স্কদের পরিচর্যা প্রভৃতি অসংখ্য পেশায় এখনও পর্যন্ত মানুষের দক্ষতার কোনো বিকল্প হয় না।
তবে মানুষের উদ্বেগ অমূলক নয়। চ্যাটজিপিটির মতো AI প্রযুক্তি ইতোমধ্যে অনেক কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলে দিয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানি কর্মীসংখ্যা কমাচ্ছে, কিছু প্রাথমিক পর্যায়ের অফিসভিত্তিক কাজ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে, এবং তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা নতুন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে অনেকের মনেই এখন প্রশ্ন জাগছে, তাহলে এটা কি কোনো বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তন অবশ্যই আসবে, কিন্তু তা চাকরির সমাপ্তির মধ্যে দিয়ে নয়; বরং চাকরির রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে। ইতিহাসে প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লবই তো এমন পরিবর্তন এনেছে। একসময় মোটরগাড়ির আবিষ্কার ঘোড়ার গাড়ির যুগের ইতি টেনেছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে জন্ম দিয়েছিল গাড়ি নির্মাণশিল্প, সড়ক অবকাঠামো, জ্বালানি ব্যবসা, পর্যটন এবং পরিবহন খাতের লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের। একইভাবে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট বহু পুরোনো কাজকে অপ্রয়োজনীয় করে তুললেও সৃষ্টি করেছে সম্পূর্ণ নতুন নতুন পেশা ও শিল্পখাত।
AI আর রোবটও সম্ভবত একই পথ অনুসরণ করবে। তারা মানুষের সব কাজ কেড়ে নেবে না; বরং এমন অনেক একঘেয়ে, পুনরাবৃত্তিমূলক ও সময়সাপেক্ষ কাজ নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে, যা মানুষের সৃজনশীলতা ও দক্ষতাকে উত্তরোত্তর বাড়াবে। যেমন , একজন সাংবাদিকের ক্ষেত্রে AI হয়তো দ্রুত সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপিটা তৈরি করতে পারবে, কিন্তু অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো একমাত্র মানুষেরই শক্তি। আবার, একজন শিক্ষকের ক্ষেত্রে AI তথ্য দিতে পারে, কিন্তু অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে না। একজন নার্স রোগীর তথ্য পর্যবেক্ষণে রোবটের সহায়তা পেতে পারেন, কিন্তু সহমর্মিতা ও মানসিক সমর্থন দিতে পারেন কেবল একজন মানুষই।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো বিশ্বের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন। বহু দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে, অথচ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমছে। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিচর্যা খাতে কর্মীর ঘাটতি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে রোবট মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং ভবিষ্যতের অপরিহার্য সহযোগী হয়ে উঠবে।
রোবট ও AI নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত বাস্তবতা, ভয় নয়। প্রযুক্তি অবশ্যই কর্মক্ষেত্রকে বদলে দেবে, নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি করবে এবং কিছু পেশাকে রূপান্তরিত করবে। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে বলা যায়, মানবাকৃতি রোবটের উত্থান মানেই মানবশ্রমের পতন নয়। বরং ভবিষ্যতের পৃথিবী সম্ভবত এমন এক জায়গা হবে, যেখানে মানুষ ও যন্ত্র থাকবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নয়, সহযোগী হয়ে। রোবট মানুষের হাতকে শক্তিশালী করবে, AI মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করবে, আর মানুষ তার সৃজনশীলতা, কল্পনা, সহমর্মিতা ও বিচারবোধ দিয়ে প্রযুক্তিকে আরও অর্থবহ করে তুলবে।
সূত্র: nautilus.com
