মানসিক চাপ ও বিবর্তনগত অসামঞ্জস্য 

মানসিক চাপ ও বিবর্তনগত অসামঞ্জস্য 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১২ জুলাই, ২০২৬

আজ প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ছবি, তাঁদের সাফল্যর ছবি, ভালো থাকার ছবি আমাদের চোখের সামনে ভেসে আছে। অন্যদিকে যে কোনো বিষয়ে নেটিজেন-দের মতামতের ছড়াছড়ি। আর আদিম মানুষ ১০০ থেকে ১৫০ জনের ছোট একটি গোষ্ঠীতে বসবাস করত। আমাদের মস্তিষ্ক এখনও সেই প্রাচীন যুগের মতোই কাজ করে। আর এই অমিলই আধুনিক জীবনের মানসিক চাপ, একাকিত্ব এবং অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার প্রবণতার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। জেমস কুক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার জোসে ইয়ং এবং সিঙ্গাপুর ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি অ্যান্ড ডিজাইন-এর গবেষক সারা চ্যান এর গবেষণা বলছে, মানুষের বিবর্তনের সময় মস্তিষ্ক এমন পরিবেশে গড়ে উঠেছে, যেখানে সবাই সবাইকে চিনত। কে বিশ্বাসযোগ্য, সমাজে কার অবস্থান কোথায় বা কোথায় বিপদ- এসব বোঝা যেত পরিচিত মানুষদের আচরণ দেখে। অথচ বর্তমান পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন। বড় শহর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং একের পর এক বৈশ্বিক সংকটের মধ্যে সেই একই মানসিক প্রবৃত্তিগুলো এখনও সক্রিয় রয়েছে। ফলে মস্তিষ্ক এমন অনেক সংকেতকে গুরুত্ব দিচ্ছে, যেগুলোর সঙ্গে বাস্তবে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনের তেমন সম্পর্কই নেই। সমস্যাটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অতীতে নিজের সামাজিক অবস্থান বোঝার প্রবৃত্তি মানুষকে সহযোগিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাস গড়ে তুলতে সাহায্য করত। কিন্তু এখন সেই একই প্রবৃত্তি সোশ্যাল মিডিয়ায় অপরিচিত মানুষের সাজানো-গোছানো জীবন, সাফল্য এবং জনপ্রিয়তার প্রদর্শনের সঙ্গে নিজের তুলনা করতে বাধ্য করছে। ফলে অনেকেরই মনে হচ্ছে অন্যরা সবসময় এগিয়ে যাচ্ছে, আর তারা পিছিয়ে পড়ছে। এই অনুভূতি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে এবং জীবন নিয়ে অসন্তোষ তৈরি করছে। গবেষক জোসে ইয়ং বলেন, “প্রতিযোগিতা নতুন কিছু নয়। তবে আধুনিক জীবন এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যেন সবাই সবসময় অন্যের নজরে রয়েছে এবং ক্রমাগত প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।” তাঁর মতে, বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায় কেন অপরিচিত মানুষের সাফল্য আমাদের মনে পিছিয়ে পড়ার ভয় তৈরি করতে পারে। তবে এই গবেষণায় নতুন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। বরং আগের বিভিন্ন গবেষণা ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ একত্র করে ‘বিবর্তনগত অমিল’ দিয়ে আধুনিক মানসিক সমস্যাগুলো বোঝার গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে মাত্র। গবেষকদের মতে, শুধু মানুষকে আরও সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বরং শহর, কর্মক্ষেত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় সম্প্রদায়- সব ক্ষেত্রেই এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যা মানুষের স্বাভাবিক মানসিক চাহিদার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে শহর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সবুজ খোলা জায়গা, শক্তিশালী সামাজিক সম্পর্ক এবং সহজে চলাচলযোগ্য পরিবেশ মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। কোনো এলাকার জনসংখ্যা বেশি হলেই যে সেখানে চাপ বেশি হবে, এমন নয়। আসলে মানুষ সেই পরিবেশকে কতটা নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক এবং সহজ মনে করছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সারা চ্যান আরও বলেন, “মানসিক চাপ, একাকিত্ব বা উদ্বেগকে আমরা সাধারণত ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু এগুলো এমন পরিবেশের ফলও হতে পারে, যা মানুষের বিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শুধু ব্যক্তিগত মানসিক শক্তি নয়, শহর ও সমাজ কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।” লক্ষ্য আধুনিক জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। বরং এমন শহর, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যা মানুষের বিবর্তনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পারে।

 

সূত্র: Evolutionary Mismatch, Stress, and Competition: Making Sense of Psychosocial Problems in the Polycrisis Era ; Behav. Sci. 2026 ; Earth . com ; July ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − fourteen =