মানসিক সুস্থতার ছয় ভিত্তি

মানসিক সুস্থতার ছয় ভিত্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

মানসিক সুস্থতা বলতে আসলে কী বোঝায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ এটিকে সুখের অনুভূতি বলেন, কেউ বলেন জীবনের সন্তুষ্টি, কেউ আবার সম্পর্ক বা আত্মমর্যাদাকে গুরুত্ব দেন। নতুন এক গবেষণায় মানসিক সুস্থতার ছটি মূল ভিত্তি চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য শুধু দুঃখ, উদ্বেগ বা মানসিক সমস্যার অনুপস্থিতি নয়। এটি গড়ে ওঠে জীবনের উদ্দেশ্য, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা, সম্পর্ক, আত্মস্বীকৃতি এবং সুখের মতো নানা উপাদানের উপর। এই গবেষণায় ১১টি ভিন্ন ভিন্ন শাখার বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। তিন ধাপের মতামত নিয়ে তাঁরা নির্ধারণ করেন, কোন বিষয়গুলোকে মানসিক সুস্থতার কেন্দ্রে রাখা উচিত। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মুম্বাইয়ের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের অধ্যাপক লিন্ডসে ওডেস। এতদিন বিভিন্ন সংস্থা বা সরকার মানসিক সুস্থতা বাড়ানোর নামে নানা কর্মসূচি চালালেও তাদের লক্ষ্য এক ছিল না। কেউ চাপ কমানোকে সাফল্য বলেছে, কেউ আবার আনন্দ বাড়ানোকে। ফলে কোন উদ্যোগ সত্যিই মানুষের জীবন বদলাচ্ছে, তা বোঝা কঠিন ছিল। অধ্যাপক ওডেস বলেন, “একটি স্বীকৃত সংজ্ঞা থাকলে সরকার জাতীয় মানসিক সুস্থতা মাপতে পারবে, জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনা করতে পারবে এবং নতুন কর্মসূচিতে সঠিকভাবে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারবে।”

গবেষণায় ব্যবহার করা হয়েছে ডেলফি পদ্ধতি। এতে বিশেষজ্ঞদের বারবার মতামত নেওয়া হয়, যাতে ধীরে ধীরে মতভেদ কমে আসে এবং একটি সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়। প্রথমে ২৬টি সম্ভাব্য দিক নিয়ে আলোচনা হয়। পরে কোনগুলো মূল বৈশিষ্ট্য আর কোনগুলো শুধু প্রভাবক, তা আলাদা করা হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯টি বিষয় ৭৫ শতাংশ সমর্থন পায়, আর ছয়টি বিষয় ৯০ শতাংশের বেশি সমর্থন নিয়ে মূল কাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গবেষকেরা বলছেন, জীবনের উদ্দেশ্য মানুষকে কঠিন সময়েও এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। সুখ ও জীবনসন্তুষ্টি দেখায় মানুষ নিজের জীবনকে কীভাবে মূল্যায়ন করছে। আত্মস্বীকৃতি, সম্পর্ক এবং স্বাধীনতা মানুষকে নিজের পরিচয়, নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি দেয়। এতে মানসিক সুস্থতাকে শুধু হাসিখুশি থাকা বা সবসময় ভালো মুডে থাকার বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা কমবে। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, আয়, বাসস্থান বা শারীরিক স্বাস্থ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এগুলো মানসিক সুস্থতার মূল সংজ্ঞা নয়। এগুলো এমন শর্ত, যা মানসিক সুস্থতাকে বাড়াতে বা কমাতে পারে। যেমন ভালো আয় চাপ কমাতে পারে, নিরাপদ বাসস্থান স্থিতি দিতে পারে, আর শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বল করতে পারে। কিন্তু এগুলো নিজেরাই “উদ্দেশ্য’’, “সংযোগ’’ বা “সন্তুষ্টি’’ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মানসিক অসুস্থতা না থাকলেই সুস্থতা আসে না। কঠিন পরিস্থিতিতেও কারও জীবনে অর্থপূর্ণ সম্পর্ক বা উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তাই চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু কষ্ট কমানো নয়, মানুষকে মূল্যবান জীবন গড়তে সাহায্য করাও হওয়া উচিত। তবে গবেষকেরা সতর্কও করেছেন, সব সমাজে “ভালো জীবন’’-এর ধারণা এক নয়। কোথাও স্বাধীনতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও পরিবার, বিশ্বাস বা সামাজিক আস্থা বেশি গুরুত্ব পায়। তবু এই ছয়টি ভিত্তি এখন স্কুল, কর্মক্ষেত্র, হাসপাতাল ও সরকারের জন্য একটি সাধারণ ভাষা তৈরি করেছে। বড় চ্যালেঞ্জ হল, সংস্কৃতি, বৈষম্য ও ব্যক্তিগত সংগ্রামকে উপেক্ষা না করে, এই ধারণাকে ব্যবহার করা।

 

সূত্রঃ earth . com ; April; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven + 8 =