মানুষের গুপ্ত সংবেদনশক্তি

মানুষের গুপ্ত সংবেদনশক্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩০ মে, ২০২৬

সম্প্রতি জানা গেছে, মানুষ স্পর্শ না করেও কোনো বস্তুর উপস্থিতি অনুভব করতে পারে। গবেষকদের মতে, মানুষের মধ্যে হয়তো এমন এক গুপ্ত সংবেদনশক্তি রয়েছে, যাকে বলা যায় রিমোট টাচ বা দূরবর্তী স্পর্শ অনুভূতি। এটি আমাদের পরিচিত পাঁচ ইন্দ্রিয়ের বাইরেও এক ধরনের সূক্ষ্ম উপলব্ধি, যেখানে সরাসরি স্পর্শ ছাড়াই আশপাশের অদৃশ্য শারীরিক সংকেত অনুভব করা সম্ভব। এবার এটাকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন আমাদের সপ্তম ইন্দ্রিয় ।

এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন এলিজাবেথা ভারসাচে এবং তাঁর সহকর্মীরা। পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের সামনে বালিভর্তি একটি বাক্স রাখা হয়। সেই বালির নীচে ছোট ছোট ঘনক লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের কাজ ছিল আঙুল দিয়ে বালির উপর হালকা নাড়াচাড়া করে বোঝা বালির নীচে কোনো বস্তু আছে কি না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তারা প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে লুকানো বস্তু শনাক্ত করতে পেরেছেন, যদিও তারা কোনো সময়ই বস্তুটিকে সরাসরি স্পর্শ করেননি।

বিজ্ঞানীরা এর ব্যাখ্যা করে বলেছেন- বালির মতো আলগা কণাযুক্ত পদার্থে হাত নাড়ালে খুব সূক্ষ্ম চাপ-তরঙ্গ তৈরি হয়। এই তরঙ্গ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মাটির নীচে থাকা কোনো কঠিন বস্তুর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মানুষের স্নায়ুতন্ত্র সেই ক্ষীণ পরিবর্তন অনুভব করতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ, আমাদের আঙুল শুধু স্পর্শ নয়, চারপাশের অতি সূক্ষ্ম যান্ত্রিক সংকেতও বুঝতে পারে।

গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল মানুষ বনাম যন্ত্রের তুলনা। একই কাজ করার জন্য একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিয়ন্ত্রিত রোবোটিক বাহুকেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। একটি বিশেষ স্পর্শ-সংবেদী সেন্সরযুক্ত রোবোটিক বাহু ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একই কাজ করানো হয়েছিল। রোবট কখনো কখনো মানুষের চেয়ে একটু বেশি দূরত্বে বস্তু টের পেলেও, সেটি প্রচুর ভুল সংকেতও দিয়েছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের নির্ভুলতা ছিল অনেক বেশি। এ থেকেই বোঝা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত সূক্ষ্ম শারীরিক সংকেত বিশ্লেষণে এখনো যন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ক্ষমতা পুরোপুরি যে নতুন তেমনটা নয়। প্রকৃতিতে এমন উদাহরণ আগেও দেখা গেছে। কিছু উপকূলীয় পাখি ভেজা বালির নীচে লুকিয়ে থাকা শিকারকে চাপের পরিবর্তন অনুভব করে খুঁজে বের করতে পারে। মাছ জলের কম্পন টের পায়, আবার অনেক প্রাণী গোঁফ/ভাইব্রেসি ব্যবহার করে বায়ু প্রবাহও অনুভব করে। মানুষের মধ্যেও হয়তো সেই আদিম সংবেদনশক্তির কিছু অবশিষ্ট অংশ এখনো রয়ে গেছে।

এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে প্রত্নতত্ত্ব, উদ্ধার অভিযান, ফরেনসিক তদন্ত এমনকি মহাকাশ অনুসন্ধানের মতো ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। যেখানে চোখে দেখা কঠিন, সেখানে রিমোট টাচ প্রযুক্তি বা প্রশিক্ষিত স্পর্শক্ষমতা লুকানো বস্তু শনাক্ত করতে সহায়ক হতে পারে। এখন গবেষকদের লক্ষ্য হলো, বালির বাইরে মাটি, ধূলিকণা বা অন্যান্য উপাদানেও মানুষ একইভাবে সংকেত অনুভব করতে পারে কি না, এবং অনুশীলনের মাধ্যমে এই ক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব কি না তা খুঁজে বের করা।

 

সূত্র: Humans have a seventh sense called ‘remote touch’ that allows us to detect objects without physical contact, according to scientists by ByEric Ralls,Earth.com staff writer, 21st May 2026, published in the journal IEEE Xplore.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − two =