মৌমাছির বিশেষ কক্ষ 

মৌমাছির বিশেষ কক্ষ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৮ জুলাই, ২০২৬

এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সাধারণ একটি মৌমাছির লার্ভাকে (শূককীট) প্রচুর রয়্যাল জেলি খাওয়ালে সেটি রানি মৌমাছিতে পরিণত হয়। সাম্প্রতিক নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে জটিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, অল্পবয়সী কর্মী মৌমাছিরা রানির জন্য বিশেষ ধরনের একটি কক্ষ তৈরি করে, যাকে ‘রয়্যাল ক্রিব’ বা রানি কক্ষ বলা হয়। এই কক্ষ সাধারণ মৌমাছির ষড়ভুজাকার কোষের মতো নয়। এটি বিশেষ ধরনের মোম দিয়ে তৈরি, যা তুলনামূলকভাবে নরম, কম ঘন এবং তাপ ও আর্দ্রতা ধরে রাখতে বেশি সক্ষম। এছাড়া এই মোমে ভিন্ন ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড ও রাসায়নিক উপাদান থাকে, যা ভবিষ্যৎ রানির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গবেষকেরা আরও একটি নতুন ধরনের কর্মী মৌমাছির সন্ধান পেয়েছেন, যাদের ‘কুইন সেল বিল্ডার’ বা রানি কক্ষ নির্মাতা বলা হচ্ছে। এরা সাধারণ কর্মী মৌমাছির তুলনায় কম বয়সী এবং রানির কক্ষ তৈরির সময় এদের শরীরের তাপমাত্রা বেশি থাকে। এই অতিরিক্ত তাপ রানির দ্রুত বেড়ে ওঠায় সাহায্য করে। যেখানে একটি কর্মী মৌমাছি পূর্ণাঙ্গ হতে প্রায় ২১ দিন সময় নেয়, সেখানে রানি মৌমাছি মাত্র ১৬ দিনেই পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানীরা একটি পরীক্ষায় একই ধরনের রয়্যাল জেলি খাওয়ানো দুটি লার্ভাকে ভিন্ন ধরনের মোমের কক্ষে লালন করেন। দেখা যায়, সাধারণ কর্মী মৌমাছির মোমের কক্ষে বেড়ে ওঠা লার্ভাগুলোর মৃত্যুহার বেশি এবং যেগুলো বেঁচে থাকে, সেগুলো আকারে ছোট হয়। অর্থাৎ, শুধু খাদ্য নয়, পরিপার্শ্বও রানি মৌমাছির বিকাশে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আরও একটি পরীক্ষায় গবেষকেরা সাধারণ মৌচাকের মোমে গ্রাফাইট মিশিয়ে দেখেন, সেই মোম পরে রানির কক্ষে ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয়, কর্মী মৌমাছিরা শুধু পুরোনো মোম ব্যবহার করে না; তারা মোম সংগ্রহ, পরিবর্তন ও সমৃদ্ধ করে বিশেষভাবে রানির কক্ষ তৈরি করে।

গবেষকদের মতে, রানি মৌমাছির বেড়ে ওঠা একটি সমষ্টিগত প্রক্রিয়া। পুরো মৌচাকের বহু কর্মী মৌমাছি একসঙ্গে কাজ করে রানির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে। গবেষণাটি এশীয় ও ইউরোপীয় উভয় প্রজাতির মধু মৌমাছির ক্ষেত্রে একই ফল দেখিয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে এই পদ্ধতি বিবর্তনের মাধ্যমে বহু আগে থেকেই গড়ে উঠেছে।

এই আবিষ্কারটি শুধু মৌমাছির জীবনচক্র বোঝার ক্ষেত্রেই নয়, জীবের বিকাশে পরিবেশ, সামাজিক সহযোগিতা এবং পারিপার্শ্বিক গুরুত্ব সম্পর্কেও নতুন ধারণা দেবে। এটি প্রমাণ করে, একটি মৌচাক শুধু অসংখ্য মৌমাছির সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি অত্যন্ত সংগঠিত ও সমন্বিত জীবন্ত ব্যবস্থা, যেখানে ভবিষ্যতের রানি তৈরিতে পুরো বসতি একসঙ্গে কাজ করে।

 

সূত্র:“Queen cell architecture shapes honey bee queen development” by Yu Fang, Beibei Ma, Xiaolu Jin, Anja Buttstedt, er.ak; 3 June 2026, Nature.DOI: 10.1038/s41586-026-10534-3

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 − 6 =