ম্যানগ্রোভ ও সুন্দরবনের কথা/৬

ম্যানগ্রোভ ও সুন্দরবনের কথা/৬

গোলপাতার জীবনকথা

এ তুমি কেমন তুমি, মানুষ দেখে লজ্জা কর,
এ তুমি কেমন তুমি, নদীর কাছে নয়ন মেলো।।
জন্মের আগেও, জন্ম পরেও, জন্ম তুমি এখন,
সুন্দরবনে থেকেও তুমি, গণ্ডয়ানার গল্প বল।।
গোলপাতা একটি জীবন্ত জীবাশ্ম পাম জাতীয় ম্যানগ্রোভ। জীবন্ত জীবাশ্ম তাকে বলে যে গাছ এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু তার সমসাময়িক অন্যান্য অনেক গাছের অবলুপ্তি হয়েছে। গোলপাতার আবির্ভাব হয়েছিল কয়েকশ বছর আগে ইওসিনি ভুতাত্ত্বিক যুগে, যা তার জীবাশ্ম থেকে প্রমান পাওয়া যায়। এই গোলপাতা গাছ পাওয়া যায় সুন্দরবনে। যেন মনে হয়, গণ্ডয়ানা ভূমির গল্প এ এখনও বলে চলেছে। পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে সমস্ত ভূখণ্ড একত্রিত ছিল। মহাদেশীয় বিচ্যুতির ফলে দক্ষিণের গণ্ডয়ানা ভূমি উত্তরের লাউরেশিয়া ভূমি থেকে সরে যায়। আনুমান করা যায়, গোলপাতার জন্ম গণ্ডয়ানা ভূমিতে হয়েছিল।
সুন্দরবনে ঘুরলে দেখা যাবে দূর মোহনার নদীর ধারে ধারে গোলপাতা গাছ সারি সারি জন্মে আছে। ভুলবশতঃ চারা নারকেল গাছ মনে হবে। কিছুটা অবাক হতে হয়। এইভাবে চারা নারকেল গাছের বন কি করে হল, অথচ কোন বড় নারকের গাছের চিহ্ন নেই। মনে হয় মানুষ দেখে এরা লজ্জা পায়, তাই লোকালয়ে এদেরকে দেখা যায় না। তাই নদীর কাছে নিজেদের নয়ন মেলে তাকায়। নদীর ধারে ধারে সারি দিয়ে জন্মায়। রায়মংগল নদীর চরে চরে এদের দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে নদীগুলোর ধারে এদের সংখ্যা বেশি। কারণ বাংলাদেশের নদী গুলোর মিষ্টি জলের পরিমাণ বেশি। মিষ্টি জল ছাড়া এদের বীজ অঙ্কুরিত হয় না। বর্ষাকালের মাঝামাঝি এদের ফুল হয়।
‘ভাদর আশ্বিন মাসে’ গোলপাতার ফুলে ভ্রমর বসে। পরাগ যোগ হয় ভাদ্র্ আশ্বিন মাসে। সাধারনতঃ ভ্রমর পরাগ যোগ ঘটায়, এছাড়াও কীটপতঙ্গ এই কাজে অংশ নেয়। এদের ফল ছোট ছোট শুকনো ডাবের মত দেখতে লাগে। পরিণত হলে এই ফলগুলি গাছ থেকে খসে যায় ও নদীর জলে ভাসতে থাকে। এছাড়াও এদের অঙ্গজ জনন হয়। গাছের কাণ্ড মাটির নিচে থাকে। এবং ঐ কাণ্ড থেকে নতুন চারাগাছের জন্ম হয়। এদের বংশ বৃদ্ধিতে অঙ্গজ জননের প্রভাব বেশি। তাই কোন অনুকুল পরিবেশে এদের সংখ্যা খুব বেশি দেখা যায়। অনেকটা এলাকা নিয়ে এরা জন্মাতে থাকে।
সুন্দরবনের যে গ্রাম গুলি বনের কাছাকাছি, ঐ সমস্ত গ্রামের চালা বাড়িগুলোর ছাউনিতে গোলপাতার ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া বেড়া বাড়িগুলোর দেওয়াল তৈরিতে গোলপাতার ডাল ব্যবহার করা হয়। গোলপাতার ফুলের মঞ্জুরির ডগা কেটে রস সংগ্রহ করা হয়। ঐ রস থেকে গুড় তৈরি করা হয়। ঐ গুড়ের ওষুধ গুণ আছে বলে শোনা যায়। বাংলাদেশে ঐ গুড়ের ব্যাবহার কোথাও কোথাও হয়ে থাকে। এ গাছের জ্বালানির ব্যাবহার প্রায় দেখা যায়।
(চলবে)