জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার হায়াবুসা–২ অভিযান মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এক অসাধারণ সাফল্যের নজির সৃষ্টি করল। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩০ কোটি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রিউগু নামক একটি গ্রহাণুর পৃষ্ঠে দুটি ছোট রোভার পাঠানো হয়েছিল। অবতরণ করার পর সেই রোভার ছবি তো তুলেই-ছে, উপরন্তু সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে। এই মিশন বিজ্ঞানীদের সৌরজগতের জন্ম এবং পৃথিবীতে জীবনের সূচনার সম্ভাব্য উৎস সম্পর্কে নতুন ধারণা দিয়েছে।
২০১৮ সালে হায়াবুসা–২ রিউগুর পৃষ্ঠে দুটি ক্ষুদ্র রোভার নামায়। আকারে এগুলো ছিল প্রায় একটি বিস্কুটের টিনের সমান। কিন্তু রিউগুর মহাকর্ষ বল এতই দুর্বল যে প্রচলিত চাকাওয়ালা রোভার সেখানে কার্যকর হতো না। চাকা ঘোরালেই রোভারটি সামনে এগোনোর বদলে মহাকাশে ছিটকে যাওয়ার ঝুঁকি ছিল। তাই প্রকৌশলীরা এক অভিনব সমাধান বার করলেন। তাঁরা তৈরি করলেন লাফিয়ে লাফিয়ে চলা রোভার। প্রতিটি রোভারের ভেতরে তাঁরা একটি ছোট ঘূর্ণায়মান মোটর লাগালেন। মোটরটি হঠাৎ ঘুরে গিয়ে টর্ক তৈরি করে আর তখনই রোভারটি মাটি থেকে লাফিয়ে ওঠে। রিউগুর দুর্বল মহাকর্ষে এক একটি লাফে রোভার প্রায় ১৫ মিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে পারত এবং প্রায় ১৫ মিনিট ধরে বাতাসহীন মহাকাশে ভেসে থাকার পর ধীরে ধীরে আবার পৃষ্ঠে নেমে আসত। এভাবেই রোভারগুলো এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পৌঁছে গ্রহাণু পৃষ্ঠের ছবি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে। সেই সংগৃহীত ছবিগুলোর একটিতে দেখা যায় প্রকৃত সূর্যালোকের ঝলক, যা মানুষ আগে কখনও ভূমি থেকে দেখতে পায়নি।
তবে হায়াবুসা–২-এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হল রিউগুর অভ্যন্তরীণ পদার্থর নমুনা সংগ্রহ করা। মহাকাশযানটি একটি বিশেষ প্রক্ষেপক ছুড়ে গ্রহাণুর পৃষ্ঠে কৃত্রিম গর্ত তৈরি করে। সেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা নতুন উপাদান সংগ্রহ করে একটি সিল করা ক্যাপসুলে সংরক্ষণ করা হয়। দীর্ঘ যাত্রা শেষে ২০২০ সালে ক্যাপসুলটি নিরাপদে অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমিতে অবতরণ করে।
পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, সংগৃহীত নমুনাগুলো সৌরজগতের জন্মলগ্নের অত্যন্ত আদিম ও প্রায় অপরিবর্তিত পদার্থ। এসব নমুনায় জৈব অণু এবং অ্যামিনো অ্যাসিড শনাক্ত হয়েছে, যা জীবনের মৌলিক রাসায়নিক উপাদান। ধারণা করা হচ্ছে, পৃথিবীর সূচনা লগ্নে রিউগুর মতো গ্রহাণুগুলোই হয়তো জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান পৃথিবীতে পৌঁছে দিয়েছিল। এই আবিষ্কার সেই ধারণাকে বিশেষ মান্যতা দিয়েছে।
একটি বিস্কুটের টিনের আকারের ছোট রোবট লাফিয়ে লাফিয়ে ৪৬০ কোটি বছরের পুরোনো এক গ্রহাণু অন্বেষণ করছে! সেখান থেকে নমুনা এনে মানবজাতির সামনে সৌরজগতের আদিম ইতিহাসের প্রমাণ দিচ্ছে! নিঃসন্দেহে আধুনিক মহাকাশবিজ্ঞানের এ এক বিশেষ অর্জন। এই মিশন প্রযুক্তিগত সক্ষমতারই প্রমাণ তো বটেই, তা ছাড়াও আমাদের নিজেদের উৎপত্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথকে আরও সুগম করেছে।
সূত্র: AstroPhilesz
