রোজালিন ইয়ালো : এক অদম্য নারীর সার্থক জীবন 

রোজালিন ইয়ালো : এক অদম্য নারীর সার্থক জীবন 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ৭ আগষ্ট, ২০২৬

রোজালিন ইয়ালো ছিলেন একজন মার্কিন পদার্থবিদ। তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। ১৯৭৭ সালে শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এবং গবেষণা-সহযোগী সলোমন বার্সনের উদ্ভাবিত রেডিওইমিউনোঅ্যাসে (Radioimmunoassay বা RIA) পদ্ধতি রক্তে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণে উপস্থিত হরমোন, ওষুধ, ভাইরাস, ভিটামিন ও অন্যান্য জৈব পদার্থ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিমাপ করার সুযোগ করে দেয় বিজ্ঞানীদের। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও গবেষণার ভিত্তি এই প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

রোজালিন সাসম্যান ইয়ালোর জন্ম ১৯২১ সালে নিউইয়র্কের সাউথ ব্রঙ্কসে। তাঁর পরিবার ছিল সাধারণ, আর্থিকভাবে খুব একটা সচ্ছল নয়। তাঁর বাবা-মা কেউই উচ্চবিদ্যালয়ের গণ্ডি পার করেননি। বাড়িতে বইও খুব বেশি ছিল না। তবুও ছোটবেলা থেকেই ইয়ালো বই পড়তে ভালোবাসতেন এবং পড়াশোনায় অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। সব বিষয়েই তিনি ভালো ছিলেন। তবে ১৯৩০-এর দশকে পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিজ্ঞানী মারি কুরির জীবনী পড়া এবং বিখ্যাত পদার্থবিদ এনরিকো ফের্মির একটি বক্তৃতা শোনার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনিও পদার্থবিদ হবেন।

তৎকালীন মার্কিন সমাজে নারীদের জন্য বিজ্ঞানচর্চা খুব সহজ ছিল না। পরিবার চেয়েছিল তিনি শিক্ষকতার পেশায় যান, কারণ সেটিই তখন শিক্ষিত নারীদের জন্য গ্রহণযোগ্য পথ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু ইয়ালো নিজের স্বপ্নে অটল ছিলেন। তিনি নিউইয়র্কের হান্টার কলেজে ভর্তি হন এবং কলেজটির ইতিহাসে পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই অনার্সসহ স্নাতক সম্পন্ন করেন। কিন্তু তার পরও তাঁর পথ সহজ ছিল না। সে সময় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থীদের গবেষণা সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে আগ্রহী ছিল না। অর্থের অভাবে তিনি উচ্চশিক্ষাও চালিয়ে যেতে পারছিলেন না। তাই তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন জৈবরসায়নবিদের সচিব হিসেবে কাজ শুরু করেন। এর বিনিময়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস করার সুযোগ পান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। অনেক পুরুষ বিজ্ঞানী যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শূন্যস্থান তৈরি হয়। ১৯৪১ সালে ইয়ালো ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদে গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে প্রায় ৪০০ জন শিক্ষকের মধ্যে তিনি ছিলেন একমাত্র নারী। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তিনি পরমাণু পদার্থবিজ্ঞানে পিএইচ ডি করেন। তেজস্ক্রিয় পদার্থ পরিমাপের যন্ত্র তৈরি ও ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেন।

মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের ভেটেরান্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (VA) হাসপাতাল-এ যোগ দেন। সেখানে তিনি রেডিওআইসোটোপ সার্ভিস নামে একটি বিভাগ গড়ে তোলেন, যার লক্ষ্য ছিল চিকিৎসাবিজ্ঞানে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করা। প্রথম গবেষণাগার হিসেবে তিনি একটি সাফাই কর্মীর ছোট ঘরকে পরীক্ষাগারে রূপান্তর করেছিলেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা।

আবার এই সময়ে তিনি সংসারও সামলাচ্ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন অ্যারন ইয়ালো। পরে তাঁর দুটি সন্তানও হয়। সে সময় কর্মস্থলের নিয়ম ছিল, গর্ভাবস্থার পাঁচ মাস পূর্ণ হলে নারী কর্মীদের কাজ করা বারণ। কিন্তু ইয়ালো এই বৈষম্যমূলক নিয়ম মানতে রাজি না। তার মতে একজন নারী একই সঙ্গে সফল বিজ্ঞানী এবং সফল মা—দুই-ই হতে পারেন।

১৯৫০ সালে তাঁর গবেষণা দলে যোগ দেন চিকিৎসক ও গবেষক সলোমন বার্সন। এরপর শুরু হয় তাঁদের ২২ বছরের দীর্ঘ গবেষণা-সহযোগিতা। প্রথমে তাঁরা রেডিওআইসোটোপ ব্যবহার করে রক্তের পরিমাণ আরও নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। পরে তাঁদের গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ইনসুলিন। ইনসুলিন নিয়ে গবেষণার একটি ব্যক্তিগত কারণ ছিল। ইয়ালোর স্বামী ডায়াবেটিসে ভুগতেন। গবেষণার সময় ইয়ালো ও বার্সন ইনসুলিনের অণুর সঙ্গে তেজস্ক্রিয় আয়োডিন যুক্ত করে খুব অল্প পরিমাণ ইনসুলিন স্বেচ্ছাসেবকদের শরীরে প্রবেশ করান। এমনকি তাঁরা নিজেদের শরীরেও এই পরীক্ষা চালান। এরপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর রক্তের নমুনা নিয়ে দেখেন ইনসুলিন কীভাবে শরীরে ভেঙে যায় এবং রক্ত থেকে বেরিয়ে যায়।

এই গবেষণায় তাঁরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আবিষ্কার করেন। তাঁরা দেখান, টাইপ–২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে ইনসুলিনের অভাবই একমাত্র সমস্যা নয়; অনেক ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিনের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, যা ইনসুলিনের কার্যকারিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই আবিষ্কার ডায়াবেটিস সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

তবে তাঁদের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল রেডিওইমিউনোঅ্যাসে (RIA) প্রযুক্তির উদ্ভাবন। এই পদ্ধতিতে তেজস্ক্রিয়ভাবে চিহ্নিত অণু ব্যবহার করে রক্তে কোনো নির্দিষ্ট পদার্থের উপস্থিতি অত্যন্ত ক্ষুদ্র মাত্রাতেও শনাক্ত করা যায়। আগে যেখানে এত কম পরিমাণ পদার্থ পরিমাপ করা সম্ভব ছিল না, সেখানে RIA বিজ্ঞানীদের গ্রাম নয়, এক গ্রামের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত পরিমাপ করার ক্ষমতা দেয়।

RIA শুধু ইনসুলিন বা হরমোন পরিমাপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন হরমোন, ওষুধ, ভিটামিন, এনজাইম, ভাইরাস, প্রোটিনসহ শতাধিক জৈব পদার্থ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ, হেপাটাইটিস ভাইরাস শনাক্তকরণ, বন্ধ্যাত্বের কারণ নির্ণয়, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির রোগ নির্ণয় এবং অসংখ্য গবেষণায় এই প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটিয়েছে।

১৯৭৭ সালে রোজালিন ইয়ালো তাঁর এই অসামান্য অবদানের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন।

 

তিনি নারীদের জন্যও এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। তিনি বিশ্বাস করতেন, বৈষম্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি করে তখনই, যখন বৈষম্যের শিকার মানুষ নিজেকে অন্যদের চেয়ে কমজোরী মনে করতে শুরু করে। দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা, লিঙ্গবৈষম্য—কোনোকিছুই একজন মানুষের প্রতিভা ও দৃঢ় সংকল্পকে থামাতে পারে না, রোজালিন ইয়ালোর জীবন তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ। তাঁর আবিষ্কার আজও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাঁর কর্মজীবন, সাহস, অধ্যবসায় এবং বিজ্ঞানের প্রতি অটুট ভালোবাসা মানবকল্যাণে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − four =