রোবোটিক হাঁটু বদলের বাড়তি সুবিধা? 

রোবোটিক হাঁটু বদলের বাড়তি সুবিধা? 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বর্তমানে হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচারে রোবটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। মনে করা হতো, রোবটের সাহায্যে কৃত্রিম হাঁটুর প্রতিস্থাপন আরও নিখুঁতভাবে করা গেলে রোগীর ব্যথা কমবে, হাঁটাচলা সহজ ও স্বাভাবিক হবে এবং সুস্থ হয়ে ওঠার গতি বাড়বে। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে বড় রোবট-সহায়িত হাঁটু প্রতিস্থাপন পরীক্ষার ফল সেই প্রত্যাশায় বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রোবটের মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের নির্ভুলতা বাড়লেও প্রথম এক বছরে রোগীর ব্যথা, চলাফেরা বা সামগ্রিক আরোগ্যে প্রচলিত অস্ত্রোপচারের সাথে চোখে পড়ার মতো কোনো হেরফের হয়নি।

যুক্তরাজ্যের রেসার-নি নামক এই গবেষণাটি পরিচালনা করেছে ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক, ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার এবং রয়্যাল অর্থোপেডিক হাসপাতাল। গবেষণাটির সম্পূর্ণ বিষয় বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয়েছে দ্য ল্যানসেট জার্নালে। যুক্তরাজ্যের ১০টি হাসপাতালের ৩৩৯ জন রোগী এবং ৩৩ জন সার্জন এই গবেষণায় অংশ নেন। এটি ছিল রোবট-সহায়িত ও প্রচলিত হাঁটু প্রতিস্থাপনের মধ্যে তুলনা করার একটি আটঘাট বাঁধা নিশ্ছিদ্র ট্রায়াল।

গবেষণায় ব্যবহৃত হয় Stryker-এর Mako রোবোটিক সিস্টেম। এতে একজন সার্জনই আগাগোড়া পুরো অস্ত্রোপচারটা নিয়ন্ত্রণ করেন, তবে রোবটিক বাহু অস্ত্রোপচারের যন্ত্রকে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। ফলে রোগীর শারীরিক গঠন অনুযায়ী কাটার কোণ ও গভীরতায় সামঞ্জস্য আনার সুযোগ বাড়ে এবং কৃত্রিম হাঁটুর অবস্থান আরও নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা যায়।

তবে এক বছর পর দেখা যায়, রোবটিক ও প্রচলিত—দুই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ফলাফল প্রায় একই। রোগীরা কৃত্রিম হাঁটুকে দৈনন্দিন জীবনে কতটা অনুভব করছেন, তা পরিমাপের জন্য ‘হাঁটুর কথা ভুলে যাওয়ার মাত্রা’ নির্ধারণ করার পরীক্ষায় দুই দলের মধ্যে অর্থপূর্ণ কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি। হাঁটার সক্ষমতা, অস্ত্রোপচারের পর প্রথম তিন মাস ও এক বছর পরের ব্যথা, হাসপাতালে থাকাকালীন ব্যথা এবং পরবর্তী অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়নি।

নিরাপত্তার দিক থেকেও রোবটিক পদ্ধতি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ প্রমাণিত হয়নি। গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার হার দুই পদ্ধতিতেই প্রায় একই।

তবে রোবটিক প্রযুক্তির কিছু স্পষ্ট অসুবিধাও রয়েছে। রোবট-সহায়িত অস্ত্রোপচারে গড়ে ১০.৫ মিনিট বেশি সময় লাগে এবং প্রতিটি অস্ত্রোপচারে প্রায় ৯৫০ পাউন্ড বেশি খরচ হয়। ফলে প্রথম বছরের ফলাফল বিবেচনায় যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচির বর্তমান ব্যয়সীমার মধ্যে এই প্রযুক্তিকে সাশ্রয়ী বলে মনে হয়নি। তবে সাশ্রয়ী নয় বলেই রোবটিক অস্ত্রোপচার ব্যর্থ, গবেষকরা এমন কোনো ইঙ্গিতও দেন নি। বরং অতিরিক্ত নির্ভুলতাকে কীভাবে রোগীর জন্য বাস্তব সুবিধায় রূপান্তরিত করা যায়, সেটিই এখন মূল লক্ষ্য। রোগীর শারীরিক গঠন অনুযায়ী হাঁটু প্রতিস্থাপনকে আরও ব্যক্তিভিত্তিক করে তুললে ভবিষ্যতে রোবটিক প্রযুক্তির সুবিধা স্পষ্ট হতে পারে।

সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের ১০ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হবে। কারণ, দীর্ঘমেয়াদে রোবটিক পদ্ধতি কৃত্রিম হাঁটুর স্থায়িত্ব বাড়ায় কি না বা ভবিষ্যতে পুনরায় অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কমায় কি না, সেই উত্তর তখনই পাওয়া যাবে। আপাতত এইটুকু বলা যেতে পারে যে রোবট হাঁটুর অস্ত্রোপচারকে আরও নিখুঁত করেছে ঠিকই, কিন্তু যতই নিখুঁত হোক, এখনো পর্যন্ত তা রোগীর জীবনে বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয় নি।

 

সূত্র: “Robotic-arm-assisted versus conventional total knee replacement (RACER-Knee): a pragmatic, multicentre, participant-masked and assessor-masked, superiority, randomised controlled trial” by Helen Parsons, Andrew Metcalfe, et.al; 20th August 2026, published in The Lancet.

DOI: 10.1016/S0140-6736(26)00986-4

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 + eleven =