স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ, আজকের আধুনিক জীবনের সর্বত্রই প্রয়োজন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির। কিন্তু এই পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে খনি, দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি ও ভূ-রাজনীতির এক কালিমালিপ্ত কাহিনী।
সাংবাদিক নিকোলাস নিয়ার্কোস তাঁর বই ‘The Elements of Power: A Story of War, Technology and the Dirtiest Supply Chain on Earth’-এ ব্যাটারির কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি-বাণিজ্য পর্যন্ত এই অদৃশ্য সরবরাহব্যবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার দিকটা তুলে ধরেছেন। বইটির পর্যালোচনা করেছেন জেমস ডেসি।
এই ব্যাটারি তৈরির কাঁচামাল আসে কোথা থেকে? লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি তৈরি করতে শুধু লিথিয়ামই নয়, আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে নিকেল, কোবাল্ট ও তামা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই খনিজগুলোর বিপুল মজুত রয়েছে, ফলে এগুলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বিশাল আন্তর্জাতিক ব্যবসা।
২০২৪ সালে বিশ্বের প্রধান লিথিয়াম উৎপাদক ছিল অস্ট্রেলিয়া, চিলি ও চীন। বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি নিকেল উৎপাদন করেছিল ইন্দোনেশিয়া। আর কোবাল্ট উৎপাদনে আধিপত্য ছিল গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র বা DRC-এর। এই দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্বের প্রযুক্তি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, এসব খনিজের উৎসস্থলের সাধারণ মানুষ সবসময় সেই সম্পদের সুফল পান না।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভূমিকা বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোকে অনেক সময় পরিবেশবান্ধব বা ‘গ্রিন টেকনোলজি’-র অংশ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু নিয়ার্কোস দেখিয়েছেন, এই প্রযুক্তির কাঁচামাল সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি কিন্তু সবক্ষেত্রে ন্যায়সংগত নয়।
খনি অঞ্চলের বহু মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করেন। তাঁরা পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ উত্তোলন করলেও সেই সম্পদ থেকে অর্জিত বিপুল অর্থের বড় অংশ তাঁদের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে, খনিজ উত্তোলন ও ব্যাটারি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত বড় কোম্পানি, সরকার এবং বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগীরা বিপুল অর্থ উপার্জন করে।
নিয়ার্কোসের মতে, এ অনেকটা ঔপনিবেশিক যুগের বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি। তখনও ধনী শক্তিগুলো সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল থেকে সম্পদ নিয়ে যেত এবং স্থানীয় জনগণ খুব কম সুবিধা পেত। আজও পৃথিবীর কিছু খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলে একই ধরনের অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা যাচ্ছে।
নিয়ার্কোসের বইটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের খনি অঞ্চলকে ঘিরে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির জন্য কোবাল্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাতু। সেই কোবাল্টের খনির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দারিদ্র্য, সংঘাত এবং নানা ধরনের শোষণের অভিযোগ।
নিয়ার্কোস তাঁর অনুসন্ধানের সময় এমন বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখিও হয়েছিলেন যে, একজন বিদ্রোহী নেতার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করায় তাঁকে কঙ্গোর পুলিশ আটক করেছিল। ওই বিদ্রোহী নেতার মিলিশিয়ার বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর ও ভয়াবহ অভিযোগও ছিল।
আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তির পেছনে সরবরাহব্যবস্থা যে কতটা জটিল এবং কখনও কখনও বিপজ্জনক এই কাহিনীই তার জলজ্যান্ত প্রমাণ।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উদ্ভাবন এবং বিবর্তনের ইতিহাসও অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই ব্যাটারির উন্নয়নে তিনজন বিজ্ঞানীর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা হলেন- ব্রিটিশ রসায়নবিদ স্ট্যানলি হুইটিংহ্যাম, মার্কিন পদার্থবিদ জন গুডএনাফ এবং জাপানি রসায়নবিদ আকিরা ইয়োশিনো। তাঁদের এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে তাঁরা রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
১৯৭০-এর দশকে হুইটিংহ্যাম দ্রুতগতির আয়ন পরিবহনের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে টাইটানিয়াম ডাইসালফাইড দিয়ে এমন একটি ক্যাথোড তৈরি করেন, যার ভেতরে লিথিয়াম আয়ন প্রবেশ করতে পারে। এটি ভবিষ্যতের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির ভিত্তি তৈরি করে।
এরপর জন গুডএনাফ প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত করেন। তিনি লিথিয়াম কোবাল্ট অক্সাইড ক্যাথোড তৈরি করেন। এর ফলে ব্যাটারির ভোল্টেজ বাড়ে এবং ব্যাটারি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হয়।
এর পরের গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি নেন আকিরা ইয়োশিনো। ১৯৮৫ সালে তিনি কার্বনভিত্তিক অ্যানোড ব্যবহার করে এমন একটি ব্যাটারি তৈরি করেন, যা বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে।
এই ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিই শেষ পর্যন্ত আধুনিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চলার পথকে আধুনিক সভ্যতার ধারাপাতে সুগম করলো।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির প্রযুক্তি উন্নয়নে জাপানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও দেশটি বেশিদিন এই বাজারের নেতৃত্ব ধরে রাখতে পারেনি। ১৯৯১ সালে জাপানি কোম্পানি সনি বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বাজারে আনে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র ধীরে ধীরে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে চলে যায়।
২০০০ সালের দিকে জাপান বিশ্বের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি বাজারের প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যে সনির বাজারদর দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং-এর তুলনায় মাত্র প্রায় এক-নবমাংশে নেমে আসে।
কোনো প্রযুক্তি প্রথম আবিষ্কার বা বাণিজ্যিকীকরণ করাই যথেষ্ট নয়। উৎপাদনব্যবস্থা, বিনিয়োগ, কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণ এবং বৃহৎ বাজার তৈরির ক্ষমতাও প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য একান্ত জরুরী।
দেখা গেছে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চৈনিক উত্থানের অধ্যায়টাও ছিল অত্যন্ত দ্রুত। বৈদ্যুতিক পরিবহনকে কেন্দ্র করে চীন ব্যাটারি প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করে। তাদের দুটি বড় লক্ষ্য ছিল—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং বায়ুদূষণ কমানো।
চীনের অগ্রগতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় বৈদ্যুতিক গাড়ির উৎপাদনকে। ২০১৮ সালে চীন সারা বছরে প্রায় ১২ লাখ ৬০ হাজার বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেছিল। কিন্তু মাত্র ছয় বছরের মধ্যে উৎপাদন এত দ্রুত বেড়ে যায় যে ২০২৪ সালে চীন এক মাসেই প্রায় ১০ লাখ বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরি করেছিল।
ধরে নেওয়া হচ্ছে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। বৈদ্যুতিক গাড়ি জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারবে এবং সৌর ও বায়ুশক্তি প্রভৃতি উৎসজাত বিদ্যুৎ সংরক্ষণে এই ব্যাটারি অপরিহার্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যাটারি প্রযুক্তির পুরো সরবরাহব্যবস্থা এখনই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ন্যায়সংগত বা পরিবেশবান্ধব হয়ে গেছে।
একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি চালানোর সময় আমরা দূষণ কমানোর কথা ভাবছি, অথচ সেই গাড়ির ব্যাটারির কাঁচামাল সংগ্রহের সময় কী ঘটছে? খনি শ্রমিকরা কী ধরনের পরিবেশে কাজ করছেন? খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলের মানুষ কি আদৌ তাঁদের সম্পদের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন? আর ব্যাটারির বৈশ্বিক বাজারজাতকরণের ফলে লব্ধ বিপুল অর্থর কতটা পৌঁছাচ্ছে সেই মানুষগুলোর কাছে, যাঁরা মাটির নীচ থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাঁচামাল তুলে আনছেন? নিয়ার্কোসের বই এই প্রশ্নগুলোকেই সামনে নিয়ে আসে।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি আধুনিক প্রযুক্তির অন্যতম বড় সাফল্য ঠিকই। কিন্তু এর সাফল্যের কাহিনীকে শুধু বৈদ্যুতিক গাড়ি, স্মার্টফোন বা নবায়নযোগ্য শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো ছবিটি দেখা হয় না। শ্রমিকের শ্রমেরও একটা দাম আছে, তাদের দৈনন্দিন ঝুঁকির খবর কটা মানুষ জানছে? মানুষ কেবল জানছে এই উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা ভবিষ্যতে আরও আধুনিক জীবন পেতে পারি বা কোন দেশ এই কাজে অগ্রগণ্য বা কার পণ্য বাজারে বেশি বিক্রি হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খনি, শ্রমিক, সরকার, কোম্পানি এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি বিশাল নেটওয়ার্ক। গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর চাহিদা দ্রুত বাড়তে থাকায় ভবিষ্যতে এই সম্পদকে কেন্দ্র করে প্রতিযোগিতাও আরও বাড়তে পারে। তাই সত্যিকারের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি তৈরি করতে হলে শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো যথেষ্ট নয়। কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশের সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের ন্যায্য অংশীদারিত্ব এবং স্বচ্ছ সরবরাহব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি নিশ্চিতভাবে আমাদের ভবিষ্যৎকে আরও বৈদ্যুতিক ও পরিবেশ বান্ধব করতে পারবে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ সত্যিই টেকসই হবে তখনই, যখন প্রযুক্তির সুবিধা যেমন সবার কাছে পৌঁছাবে, তেমনি কোনো দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছ থেকে অন্যায় মূল্যে সেগুলো সংগৃহীত হবে না।
সূত্র: https://physicsworld.com/a/the-dark-heart-of-the-lithium-ion-battery-revolution/
