সংকটের মুখে সাগর জগৎ

সংকটের মুখে সাগর জগৎ

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২০ জুন, ২০২৬

পৃথিবীর সমুদ্র আজ অভূতপূর্ব সংকটের মুখে। সমুদ্রের জল দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, ভেঙে পড়ছে প্রবালপ্রাচীরের বাস্তুতন্ত্র। তাছাড়া বলা হচ্ছে আর্কটিক মহাসাগর আগামী এক-দুই দশকের মধ্যেই গ্রীষ্মকালে বরফশূন্য হয়ে যেতে পারে। রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রকাশিত তৃতীয় ‘ওয়ার্ল্ড ওশান অ্যাসেসমেন্ট’ বা বিশ্ব মহাসাগর মূল্যায়ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদনটি তৈরি করতে পাঁচ বছর সময় নিয়েছেন বিশ্বের ৬০০ জন বিজ্ঞানী। ১,৩৫২ পাতার এই বিশদ মূল্যায়নে মূলত ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সমুদ্রে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলির বিশ্লেষণ করা হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পাঁচ বছর আধুনিক ইতিহাসে সমুদ্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংকটপূর্ণ সময়গুলির একটি। পৃথিবীতে জীবনের ভিত্তি হল সমুদ্র। কিন্তু বর্তমানে সমুদ্রের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বহু সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র এমন এক সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হতে পারে। মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলে যে অতিরিক্ত তাপ জমা হয়েছে, তার ৯০ শতাংশেরও বেশি শোষণ করেছে সমুদ্র। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় ৩০ শতাংশও সমুদ্রই শোষণ করেছে। এর ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আরও দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু সেই ‘মূল্য’ এখন সমুদ্রকেই দিতে হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ১৯৫৫ সালের পর থেকে সমুদ্রে যে পরিমাণ তাপ জমা হয়েছে, তার প্রায় ১৬ শতাংশই যুক্ত হয়েছে শুধুমাত্র ২০১৮-২০২৩ এই পাঁচ বছরে। উষ্ণ জলের আয়তন বাড়ে। তার সঙ্গে হিমবাহ ও বরফচাদর গলে যাওয়ার জল যুক্ত হওয়ায় দ্রুত বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। ২০১৫ সালের আগে যেখানে বছরে দুই মিলিমিটারেরও কম হারে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছিল, ২০২৩ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে বছরে ৪.৩ মিলিমিটার। সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে আর্কটিক অঞ্চলে। গবেষকদের মতে, নির্গমন কমানোর সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতেও এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে সেপ্টেম্বর মাসে আর্কটিক মহাসাগর সম্পূর্ণ বরফমুক্ত হয়ে যেতে পারে। কিছু পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০৩০-এর দশকেই এমন পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে, অ্যান্টার্কটিকার সমুদ্রবরফও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ২০১৬ সালের পর থেকে সেখানে বরফের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। অর্থাৎ পৃথিবীর দুই মেরুই একই সঙ্গে বিপজ্জনক পরিবর্তনের মুখে। প্রতিবেদনে প্রবালপ্রাচীর নিয়েও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা যদি শিল্পযুগ-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে যায়, তবে বিশ্বের ৯০ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। ঘন ঘন সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ ও ঝড়ের কারণে প্রবালগুলি পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না। সমুদ্র দূষণও বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতি বছর প্রায় ৫ কোটি ২১ লক্ষ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে পৌঁছায়। এগুলি ভেঙে প্রায় ২৪ লক্ষ কোটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণায় পরিণত হয়, যা সমুদ্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যেই ৪,০০০-রও বেশি প্রাণী প্রজাতির ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ মিলেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, “সমুদ্রকে আর অসীম সম্পদের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং যৌথ দায়িত্বের মাধ্যমে সমুদ্রের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে”। বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট বার্তা—”পথ পরিবর্তনের জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে”।

 

সূত্র: Earth.com ; June ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + ten =