সংবাদে অবসাদ 

সংবাদে অবসাদ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৪ জুন, ২০২৬

প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পর স্মার্টফোন খুললেই চোখে পড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু বিপর্যয় কিংবা সহিংসতার খবর। একের পর এক নেতিবাচক ঘটনার এই অবিরাম প্রবাহ বর্তমানে অনেক মানুষের কাছেই এখন মানসিক ক্লান্তির কারণ হয়ে উঠছে। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকে বলছেন “নিউজ ফ্যাটিগ” বা সংবাদে অবসাদ। বিশ্ব জুড়ে এ একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতা – মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে খবর এড়িয়েই চলে।

সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ অন্তত কোনো না কোনো সময় সংবাদ এড়িয়ে যান। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন, খবর তাদের মন খারাপ করে দেয়, উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং এমন এক অসহায়ত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে, যেখানে সমস্যাগুলোর ব্যাপারে জানলেও বাস্তবে কিছু করার সুযোগ থাকে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতার শিকড় লুকিয়ে আছে মানব বিবর্তনের ইতিহাসে। হাজার হাজার বছর আগে মানুষের টিকে থাকার জন্য বিপদের সংকেত দ্রুত শনাক্ত করা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঝোপের আড়ালে শিকারি প্রাণীর উপস্থিতি বা শত্রুর আক্রমণের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকাটা জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন ছিল। ফলে মানবমস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই নেতিবাচক তথ্যের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানে এই বৈশিষ্ট্যকে বলা হয় “নেগেটিভিটি বায়াস”—অর্থাৎ, নেতিবাচক ঘটনা ইতিবাচক ঘটনার তুলনায় আমাদের মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করে এবং দীর্ঘ সময় স্মৃতিতে রয়ে যায়।

এখন সমস্যা হলো, মানুষের মস্তিষ্ক আজও মূলত সেই প্রাচীন কাঠামো নিয়েই কাজ করছে, অথচ তথ্যের পরিবেশ আমূল বদলে গেছে। অতীতে মানুষ কেবল নিজের আশপাশের বিপদ সম্পর্কে জানত। কিন্তু এখন একটা স্মার্টফোনের পর্দায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধ, দুর্যোগ, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক সংঘাতের খবর পৌঁছে যায়। আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এমন বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক সংকট সামাল দেওয়ার জন্য কখনও প্রস্তুত ছিল না।

গবেষণায় দেখা গেছে, সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক শিরোনাম মানুষের দৃষ্টি বেশি আকর্ষণ করে। এর কারণ, মানুষের মস্তিষ্ক সম্ভাব্য বিপদের প্রতি স্বাভাবিকভাবেই বেশি সতর্ক। ফলে সংবাদ গ্রহণ অনেক সময় তথ্য সংগ্রহের চেয়ে আবেগীয় প্রতিক্রিয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এই প্রবণতার মানসিক মূল্যও কম নয়। অতিরিক্ত নেতিবাচক সংবাদ উদ্বেগ, মানসিক চাপ, হতাশা এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি বাড়াতে পারে। কিছু গবেষক এমনকি “প্রবলেম্যাটিক নিউজ কনজাম্পশন” নামে একটি ধারণার কথা বলছেন, যেখানে সংবাদ অনুসরণ করা মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করে।

তবে সংবাদ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা এর সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক সমাজে সচেতন নাগরিক হওয়ার জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা দরকার। বরং বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, খবর পড়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আবেগনির্ভর কনটেন্টের পরিবর্তে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করা এবং কোন বিষয়গুলোতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, সেদিকে মনোযোগ দেওয়া।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীর সংবাদচিত্র এরকমই। কিন্তু কোন সংবাদকে কীভাবে গ্রহণ করব এবং কতটা গুরুত্ব দেব, সেই সিদ্ধান্ত আমাদের ই হাতে। সচেতনতা ও মানসিক ভারসাম্যের মধ্যে একটি সুস্থ সমন্বয় গড়তে পারলেই সংবাদ আমাদের জ্ঞানের উৎস হবে, নয়তো সেটা দেখলেই মানসিক ক্লান্তি আসবে।

 

 

সূত্র: Adapted from an article originally published in The Conversation.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − two =