১৬৩৩ সালের ২২ জুন। ইতালির রোমে ইতিহাসের এক বেদনাময় দিন। সেদিন ৭০ বছর বয়সী বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলেইকে ক্যাথলিক চার্চের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এমন একটি বৈজ্ঞানিক মতবাদ প্রচার করেছেন যা চার্চের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত বিশ্বাসের বিরোধী। সেই মতবাদ ছিল—পৃথিবী নয়, সূর্যই সৌরজগতের কেন্দ্র, আর পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে পরিভ্রমণ করে। এই ধারণার প্রবর্তক ছিলেন পোল্যান্ড জাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নিকোলাস কোপার্নিকাস। কিন্তু গ্যালিলিও নিজ হাতে নির্মিত দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করে সেই তত্ত্বের পক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ হাজির করেন। ১৬৩২ সালে তিনি ডায়ালগ কনসার্নিং দ্য টু চিফ ওয়ার্ল্ড সিস্টেমস নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে সূর্যকেন্দ্রিক ও ভূকেন্দ্রিক মতবাদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়। চার্চের চোখে এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ ১৬১৬ সালেই চার্চ ঘোষণা করেছিল, বাইবেলের প্রচলিত ব্যাখ্যার বিরোধী কোনো মতবাদ প্রচার করা যাবে না। দীর্ঘদিন নিজের বৈজ্ঞানিক অবস্থানে অটল থাকার পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুভয়ে গ্যালিলিওকে ক্যাথলিক আদালতের সামনে নতি স্বীকার করতে হয়। মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কায় তিনি ইচ্ছার বিরুদ্ধে লিখিতভাবে ঘোষণা করেন যে সূর্যকে মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং পৃথিবীকে তার চারপাশে ঘূর্ণমান বলাটা তাঁর ভুল হয়েছিল। পাশাপাশি তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ভবিষ্যতে আর কখনও এই মতবাদ প্রচার করবেন না। এরপর তাঁর বই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং বহু কপি পুড়িয়ে ফেলা হয়। কিন্তু শাস্তি সেখানেই থেমে থাকেনি। জীবনের শেষ নয় বছর তাঁকে গৃহবন্দি অবস্থায় কাটাতে হয়। কিন্তু গ্যালিলিও থেমে যাননি। গৃহবন্দি থাকাকালেই তিনি টু নিউ সায়েন্সেস নামে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। সেন্সরশিপ এড়াতে গ্রন্থটি গোপনে দেশের বাইরে পাচার করে নেদারল্যান্ডসে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এই বই আধুনিক নব্য পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণে বিরাট অবদান রাখে। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গ্যালিলিওর পক্ষেই রায় দিয়েছে। ১৯৯২ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেন, গ্যালিলিওকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল ক্যাথলিক চার্চের একটি ঐতিহাসিক ভুল। যে মতবাদ একসময় ধর্মদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, আজ সেটিই প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য- পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। ধর্মকে বিজ্ঞানের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছে। গ্যালিলিওর জীবন তাই শুধু একজন বিজ্ঞানীর গল্প নয়, এ হল সত্য, যুক্তি এবং স্বাধীন চিন্তার পক্ষে, বিজ্ঞানের উপর ধর্মের অন্যায় অযৌক্তিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে, মানুষের দীর্ঘ অনিঃশেষ সংগ্রামের প্রতীক।
সূত্র: Nautilus ; June ; 2026
