গেম থিওরির সবচেয়ে বিখ্যাত ধারণাগুলোর একটি হলো “প্রিজনার্স ডিলেমা”/কারাবন্দীর সংকট । এ এমন এক পরিস্থিতি যেখানে দুজন মানুষ বা দুটি পক্ষ একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা না করে কেবল নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করে কাজ করে, যার ফলে দিনের শেষে উভয়ের ফলাফলই সবচেয়ে খারাপ হয়। সেক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো: মানুষ কি একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, নাকি নিজের স্বার্থে প্রতারণার পথ বেছে নেবে? বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, যদি প্রত্যেকে কেবল নিজের লাভের কথা চিন্তা করে, তাহলে প্রতারণাই হবে সবচেয়ে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু নতুন এক গবেষণা এই ধারণাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছে।
ধরা যাক, একই অপরাধে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের সামনে দুটি পথ খোলা: এক, নীরব থেকে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা করা, অথবা অপরজনকে ফাঁসিয়ে দিয়ে নিজের শাস্তি কমানো। যদি দুজনই চুপ থাকে, তাহলে উভয়েরই তুলনামূলকভাবে কম সাজা হবে। কিন্তু একজন যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে আর অন্যজন নীরব থাকে, তাহলে বিশ্বাসঘাতক মুক্তি পাবে এবং অন্যজন কঠোর শাস্তি পাবে। এই ভয়ে প্রায়ই দুজনই দুজনকে ফাঁসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ফলস্বরূপ, দুজনেরই ক্ষতি হয়। এই পরিস্থিতিকেই বলা হয় ন্যাশ সমীকরণ/ ন্যাশ সাম্যাবস্থা।
এই মডেলটাই বহু দশক ধরে জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন সবসময় থেকেই গেছে: যদি প্রতারণাই সবচেয়ে লাভজনক কৌশল হয়, তাহলে প্রকৃতি ও মানবসমাজে এত ব্যাপক সহযোগিতা দেখা যায় কেন?
এই মোক্ষম প্রশ্নের মুখে পড়ে রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ আলেক্সান্দ্রে মোরোজভ এবং জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আলেকজান্ডার ফেইগেল নতুন একটি মডেল তৈরি করেছেন। প্রচলিত প্রিজনার্স ডিলেমায় ধরে নেওয়া হয়, একজন ব্যক্তি হয় সবসময় সহযোগী, নয়তো সবসময় প্রতারক। কিন্তু বাস্তব জীবনে মানুষ এতটা সরল নয়। আমরা কারও সঙ্গে সহযোগিতা করি, আবার কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা বা প্রতারণা করি। আমাদের আচরণ নির্ভর করে আমরা কার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করছি তার ওপর।
গবেষণাটি থেকে দেখা যায়, যদি মানুষ অন্যদের চিনতে পারে এবং তাদের সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন পছন্দ বা ধারণা রাখে, তাহলে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সহযোগিতা গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ, সহযোগিতা বজায় থাকার জন্য কোনো বিশেষ নৈতিকতা, আত্মত্যাগ বা জিনগত আত্মীয়তার প্রয়োজন নেই। শুধু দরকার অন্য ব্যক্তিকে শনাক্ত করার ক্ষমতা এবং সেই অনুযায়ী আচরণ পরিবর্তনের সুযোগ।
মোরোজভের মতে, বাস্তব সমাজে মানুষ কখনোই “নায়ক” বা “খলনায়ক” এই দুই চরম শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং অধিকাংশ মানুষ পরিস্থিতি ও সম্পর্ক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়। এই বাস্তবতাকে মডেলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতেই দেখা গেছে যে সহযোগিতা কেবল সম্ভবই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থিতিশীল সামাজিক কৌশল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
মানবসমাজ, রাজনীতি এবং সামাজিক সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণার অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পারস্পরিক পরিচয়, বিশ্বাস এবং সম্পর্কের ভিত্তিতে সহযোগিতা গড়ে তোলা মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে। ফলে সমাজে সহযোগিতার বিকাশ ব্যাখ্যা করতে সবসময় কঠোর নিয়ম বা নিঃস্বার্থতার ধারণার ওপর নির্ভর করতে হয় না। অনেক সময় মানুষ কার সঙ্গে কাজ করছে কেবল সেটা জানলেই, সহযোগিতার পথ নিজে থেকেই উন্মুক্ত হয়ে যায়।
সূত্র: https://nautil.us/does-cooperation-beat-cheating-after-all-1282013
