সৌর-তাপে জল লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি

সৌর-তাপে জল লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১০ জুলাই, ২০২৬

আজকের পৃথিবীতে নিরাপদ পানীয় জলের সংকট দিন দিন বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ নিরাপদ পানীয় জলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে পৃথিবীর মহাসাগরগুলোতে বিপুল পরিমাণ জল থাকলেও তা লবণাক্ত হওয়ায় সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। সমুদ্রের জলকে পানযোগ্য করতে বর্তমানে মূলত রিভার্স অসমোসিস/বিপরীত অভিস্রবন এবং থার্মাল ডিস্টিলেশন/ তাপীয় পাতন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব পদ্ধতিতে প্রচুর শক্তি লাগে এবং প্রক্রিয়ার শেষে অত্যন্ত লবণাক্ত বর্জ্য/ব্রাইন তৈরি হয়। এগুলো সমুদ্রে ফিরে গিয়ে সামুদ্রিক পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে।

এই সমস্যার সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব রচেস্টার-এর গবেষকেরা সূর্যের আলো ব্যবহার করে একটি নতুন সৌর-তাপীয় লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি তৈরি করেছেন। গবেষণাটির বিষয় বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয়েছে লাইট: সায়েন্স অ্যান্ড অ্যাপ্লিকেশন জার্নালে।

এই প্রযুক্তির মূল অংশ হলো সুপারউইকিং ব্ল্যাক মেটাল (SWBM) নামক একটি বিশেষ ধাতব প্যানেল। ফেমটোসেকেন্ড লেজারের সাহায্যে তৈরি এই প্যানেল সূর্যের প্রায় সব আলো শোষণ করে দ্রুত গরম হয়ে যায়। একই সঙ্গে এটি খুব সহজে জল টেনে নিজের পৃষ্ঠে ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পাতলা জলের স্তর দ্রুত বাষ্পে পরিণত হয় এবং পরে সেই বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বিশুদ্ধ পানীয় জলে রূপান্তরিত হয়।

নতুন এই পদ্ধতির আরেকটি বড় সুবিধা হলো, এতে সমুদ্রে কোনো লবণাক্ত বর্জ্য ফেরত পাঠানো হয় না। বরং অবশিষ্ট লবণ সংগ্রহ করে সাধারণ খাদ্য লবণ বা শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, সমুদ্রের জলে অতি অল্প পরিমাণে থাকা লিথিয়ামসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজও এই প্রক্রিয়ায় আহরণ করা যায়। বর্তমানে বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংরক্ষণের ব্যাটারির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে লিথিয়ামের বিশ্বব্যাপী চাহিদাও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভবিষ্যতে সমুদ্রের জল থেকে এই খনিজ সংগ্রহ করা গেলে তা খনির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প তৈরি করতে পারে।

গবেষকেরা প্রযুক্তিটি বাস্তব পরিবেশে যাচাই করার জন্য প্রশান্ত, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগরের জলের নমুনা ব্যবহার করেছেন। পরীক্ষায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক সূর্যালোকে প্রতি ঘণ্টায় প্রতি বর্গমিটারে গড়ে ১.৭৬ লিটার জল বাষ্পীভূত করা সম্ভব হয়েছে। সৌরশক্তিকে বাষ্পে রূপান্তরের দক্ষতা ছিল ৭৪ শতাংশ, আর লবণ আহরণের দক্ষতা পৌঁছেছে প্রায় ১০০ শতাংশে। বাস্তব সমুদ্রের জল ব্যবহার করে এত উচ্চ দক্ষতা অর্জন এই প্রযুক্তির কার্যকারিতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

এবার গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিটিকে আরও বড় আকারে বাস্তব ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা। ইতিমধ্যে তাঁরা দেখিয়েছেন, এই ডিস্যালিনেশন ব্যবস্থাকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত করলে সৌর প্যানেল ঠান্ডা রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা বাড়ানো এবং বিশুদ্ধ জল উৎপাদন—তিনটি কাজই একসঙ্গে করা সম্ভব। ভবিষ্যতে এমন সমন্বিত ব্যবস্থা জলের সংকট ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির চাহিদা—উভয় সমস্যারই কার্যকর সমাধান হয়ে উঠতে পারে। ক্রমবর্ধমান জলসংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই উদ্ভাবন একটি অভিনব প্রযুক্তি তো বটেই ;  পাশাপাশি এটি এমন একটি টেকসই ভবিষ্যতেরও ইঙ্গিত, যেখানে সূর্যের অফুরন্ত শক্তি ব্যবহার করে একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানীয় জল, মূল্যবান খনিজ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সমন্বিত উৎপাদন সম্ভব হবে।

সূত্র:  Solar-thermal desalination process operates at near 100% efficiency – Physics World

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + 2 =