সমুদ্রে বা নদীর তলদেশে শান্তভাবে লুকিয়ে থাকে স্টিংরে। অনেকেই এদের নিরীহ বলে মনে করেন। কিন্তু বিপদের মুখে পড়লে এদের লেজের বিষাক্ত শিরদাঁড়া-ই হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর অস্ত্র। আর সেই শিরদাঁড়ার আঘাতে শুধু গভীর ক্ষতই হয় না, বিষ শরীরে প্রবেশ করে তীব্র যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। তবে সব স্টিংরের শিরদাঁড়া এক রকম নয়। বরং তাদের আকার-আকৃতির পার্থক্যের পেছনে রয়েছে বেঁচে থাকার ভিন্ন ভিন্ন কৌশল এবং দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস। গবেষকেরা পাঁচটি ভিন্ন পরিবারের মোট ৩০ প্রজাতির স্টিংরের কাঁটা বা শিরদাঁড়া বিশ্লেষণ করেছেন। কাঁটার গঠন, শক্তি এবং কার্যকারিতা বোঝার জন্য আধুনিক কম্পিউটারভিত্তিক ফাইনাইট এলিমেন্ট অ্যানালিসিস-এর পাশাপাশি কৃত্রিম উপাদানে কাঁটা ঢোকানো ও বের করার পরীক্ষাও চালান। স্টিংরের কাঁটা মূলত দুটি ভিন্ন ধরনের নকশায় বিবর্তিত হয়েছে। এক ধরনের কাঁটা লম্বা, সরু এবং অত্যন্ত ধারালো। এগুলি শিকারি প্রাণীর শরীরে খুব সহজেই গভীরভাবে ঢুকে যেতে পারে। তবে এর একটি বড় অসুবিধাও রয়েছে। খুব সরু হওয়ায় অতিরিক্ত চাপ পড়লে কাঁটা ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বেশি। কিন্তু সেটিই আবার কখনও কখনও স্টিংরের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ কাঁটার ভাঙা অংশ যদি শিকারির শরীরের ভেতরে থেকে যায়, তাহলে আঘাত আরও গুরুতর হয়। এতে শিকারি ব্যথায় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সেই সুযোগে স্টিংরে দ্রুত পালিয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে কিছু স্টিংরের কাঁটা তুলনামূলকভাবে মোটা, চওড়া এবং অনেক শক্ত। এগুলি সহজে ভাঙে না এবং বহুবার আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করা যায়। যদিও এই ধরনের কাঁটা খুব গভীরে প্রবেশ করতে পারে না, তবুও শরীরে শক্তভাবে আটকে থাকার ক্ষমতা এর বেশি। ফলে আক্রমণকারী প্রাণীর পক্ষে কাঁটাটি বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই দুই ধরনের কাঁটাই কার্যকর, তবে তাদের কাজের ধরন আলাদা। একদিকে রয়েছে এমন কাঁটা, যা দ্রুত ঢুকে ভেঙে গিয়ে শত্রুর শরীরের ভেতরে থেকে সর্বাধিক ক্ষতি করে। অন্যদিকে রয়েছে এমন কাঁটা, যা দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য এবং বারবার আত্মরক্ষার সুযোগ দেয়। তাছাড়া দেখা গেছে, মিষ্টি জলের স্টিংরেগুলির মধ্যে সাধারণত শক্ত ও টেকসই কাঁটাই বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, নদী বা হ্রদের পরিবেশে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ এবং শিকারিদের ধরন সমুদ্রের তুলনায় আলাদা হওয়ায় সেখানে বারবার ব্যবহারযোগ্য কাঁটার বিবর্তন বেশি সুবিধাজনক হয়েছে। একটি কাঁটা একই সঙ্গে সব দিক থেকে সেরা হতে পারে না। যদি কাঁটা খুব ধারালো করা হয়, তাহলে তা সহজে ভেঙে যেতে পারে। আবার যদি খুব শক্ত ও মোটা করা হয়, তাহলে গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, ধারালো হওয়া, শরীরে আটকে থাকার ক্ষমতা এবং দীর্ঘস্থায়িত্ব- এই তিনটির মধ্যে প্রকৃতিকে সবসময় একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে। এই একই ধরনের যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা শুধু স্টিংরের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য প্রাণীর কাঁটা, দাঁত, হুল, শিং প্রভৃতি আত্মরক্ষার অস্ত্রের বিবর্তনেও দেখা যায়। তাই স্টিংরের বিষাক্ত কাঁটা শুধু একটি প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র নয়, বরং কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের এক অসাধারণ উদাহরণ, যা দেখায় কীভাবে প্রকৃতি বিভিন্ন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সমাধান তৈরি করেছে।
সূত্র: https:// doi. org /10.1098/rspb.2026.0545
