স্টুডেন্টস টি- টেস্টের জন্মকথা 

স্টুডেন্টস টি- টেস্টের জন্মকথা 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৭ জুলাই, ২০২৬

আজ চিকিৎসাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, অর্থনীতি—প্রায় প্রতিটি গবেষণাক্ষেত্রেই একটি পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর নাম স্টুডেন্টস টি-টেস্ট । গবেষকেরা ছোট একটি নমুনা বিশ্লেষণ করে পুরো জনসংখ্যা সম্পর্কে কতটা নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নির্ধারণে এই পদ্ধতি অপরিহার্য। এই বিশ্বখ্যাত পদ্ধতির জন্ম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে নয়, বরং একটি বিখ্যাত বিয়ার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের কারখানায়।

বিশ শতকের শুরুতে গিনিস ব্রিউয়ারি/ভাঁটিখানা ছিল একটি বিশ্ববিখ্যাত আইরিশ ডার্ক স্টাউট বিয়ার প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান। আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ১৭৫৯ সালে আর্থার গিনিস এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানকার প্রধান পরীক্ষামূলক সুরা প্রস্তুতকারী ছিলেন উইলিয়াম সিলি গোসেট। সেসময় কোম্পানি উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল , কীভাবে অল্প কয়েকটি নমুনা পরীক্ষা করেই বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের গুণমান নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা যাবে?

যেমন ধরা যাক, গিনিস এমন হপ ফুল কিনতে চায়, যাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ আঠালো রজন রয়েছে। বিয়ার তৈরিতে রজন মূলত স্বাদ ও গন্ধের জন্য ব্যবহৃত হয়। এখন কথা হচ্ছে পুরো ক্ষেতের প্রতিটি হপ ফুল তো পরীক্ষা করা অসম্ভব। আবার হাজার হাজার নমুনা পরীক্ষা করলে সময় ও অর্থের অপচয় হবে। তাই অল্প কয়েকটি নমুনা পরীক্ষা করে যদি পুরো ফসলের মান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাহলে উৎপাদন আরও দ্রুত ও সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু তখনকার পরিসংখ্যানবিদরা মূলত বড় বড় নমুনা নিয়ে কাজ করতেন। ছোট নমুনা থেকে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার কার্যকর কোনো পদ্ধতি তখনও গড়ে ওঠেনি।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ১৯০৬ সালে গিনিস ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন-এ পাঠায় গোসেটকে। সেখানে তিনি খ্যাতনামা জীবপরিসংখ্যানবিদ কার্ল পিয়ারসন -এর কাছ থেকে আধুনিক পরিসংখ্যানের শিক্ষা নেন। এরপর তিনি ছোট ও বড় নমুনার গড়ের পার্থক্য বিশ্লেষণ করে দেখান যে, ছোট নমুনায় স্বাভাবিকভাবেই অনিশ্চয়তা বা বিচ্যুতি বেশি থাকে। তাই বড় নমুনার জন্য ব্যবহৃত মামুলি নরমাল ডিস্ট্রিবিউশন ছোট নমুনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নির্ভুল নয়।

এরপর তিনি তৈরি করেন টি-ডিস্ট্রিবিউশন । এটি দেখতে ঘণ্টার আকৃতির বক্ররেখার মতো হলেও এর মাঝের অংশ তুলনামূলক নীচু এবং দুই পাশের অংশ কিছুটা মোটা। এই বৈশিষ্ট্য ছোট নমুনার অতিরিক্ত অনিশ্চয়তাকে সঠিকভাবে হিসেবের মধ্যে আনে এবং গবেষণার ফলকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

১৯০৮ সালে গোসেট তাঁর গবেষণাটি বিস্তারিতভাবে ‘বায়োমেট্রিকা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। তবে তিনি নিজের নামে নয়, ‘স্টুডেন্ট’ ছদ্মনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, গিনিস বিয়ার তৈরির কারখানাটি চায়নি তাদের গবেষণার কৌশল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রকাশ পাক। সেই থেকেই এই পদ্ধতির নাম হয়ে যায় স্টুডেন্টস টি-টেস্ট।

পরে প্রখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ রোনাল্ড ফিশার এই পদ্ধতিকে আরও উন্নত করেন এবং আধুনিক গবেষণার উপযোগী করে তোলেন। বর্তমানে টি-টেস্ট ব্যবহার করে গবেষকেরা নির্ধারণ করতে পারেন, দুটি দলের গড়ের মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা সত্যিই অর্থবহ, নাকি কেবল কাকতালীয়ভাবে ঘটেছে।

আজ নতুন ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা, রোগ নির্ণয়, কৃষিতে নতুন জাতের ফলনের মূল্যায়ন, পরিবেশ গবেষণা, মনোবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান, এমনকি সামাজিক বিজ্ঞানেও টি-টেস্ট ছাড়া গবেষণা কল্পনা করা কঠিন। সীমিত তথ্য থেকেও নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ করে দিয়ে এটি আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই যুগান্তকারী পরিসংখ্যানগত পদ্ধতির জন্ম হয়েছিল কোনো যুদ্ধ, মহাকাশ অভিযান বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রয়োজনে নয়। হয়েছিল শুধুমাত্র আরও উন্নত মানের ডার্ক স্টাউট বিয়ার তৈরির চেষ্টায়! গিনিস বিয়ার তৈরির কারখানার উৎপাদন সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে করা সেই গবেষণাই আজ বিশ্বের অসংখ্য বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, চিকিৎসা গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নেপথ্যের অন্যতম ভিত্তি। বাস্তব জীবনের একেকটা ছোট ছোট সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টাও কখনো কখনো বিজ্ঞানে অসাধারণ অবদান রাখতে পারে।

 

সূত্র: Nautilus Magazine

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen + two =