দৈনন্দিন জীবনের অসংখ্য ঘটনা ও অভিজ্ঞতার সবকিছুই কি মস্তিষ্কে স্মৃতি হিসেবে জমা থাকে? না। কিছু ঘটনা দীর্ঘদিন মনে থেকে যায়, আবার অসংখ্য অভিজ্ঞতা অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্মৃত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, কোন অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে জায়গা পাবে, আর কোনটি হারিয়ে যাবে, সেটা ঠিক করে দেয় আমাদের মস্তিষ্কের একটি ছোট্ট অংশ, অ্যামিগডালা। অ্যামিগডালা অনেকটা বাদাম আকৃতির। দেখতে ছোট হলেও এর দায়িত্ব বেশি বই কম নয়। এ শুধু আবেগ বা ভয়ের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণই করে না, কোন অভিজ্ঞতা দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষিত হবে, তাও নির্ধারণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেডার্স-সিনাই হেলথ সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অ্যামিগডালার এই নতুন ভূমিকার সন্ধান পেয়েছেন। এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, অ্যামিগডালার প্রধান কাজ ভয় বা তীব্র আবেগের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞতা মনে রাখতে সাহায্য করা। কিন্তু সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেল, সাধারণ অভিজ্ঞতাকেও দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত করার ব্যাপারে এই অংশের ভূমিকা অনেক ব্যাপক।
গবেষকদের মতে, অ্যামিগডালা যেন একটা ছাঁকনি। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য নতুন দৃশ্য ও অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই। এবার এই অংশটির কাজ হল, তার মধ্যে বাছাই করা কিছু অভিজ্ঞতাকে চিহ্নিত করা, যাতে সেগুলি দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে সংরক্ষিত হতে পারে এবং পরে একটুতেই মনে পরে যায়।
অ্যামিগডালার এই বিশেষ কাজ বোঝার জন্য গবেষকেরা মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসানো ১১২ জন মৃগীরোগীর স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করেন। রোগীদের মস্তিষ্কে খিঁচুনি পর্যবেক্ষণের জন্য অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই ইলেকট্রোড বসানো হয়েছিল। তাঁদের প্রথমে এমন কিছু ছবি দেখানো হয়, যেগুলি তাঁরা আগে কখনও দেখেননি। কয়েক ঘণ্টা পর ছবিগুলির কতটা মনে রাখতে পারছেন, তা পরীক্ষা করা হয়।
দেখা যায়, অ্যামিগডালার নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুকোষ বিশেষ ধরনের ছবির প্রতি সাড়া দেয়। যেমন, কোনও কোষ মানুষের মুখের ছবি দেখে সক্রিয় হয়, কোনওটি প্রাণীর ছবি দেখে, আবার কোনওটি প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্রতি সাড়া দেয়। কোনও ছবির প্রতি সংশ্লিষ্ট স্নায়ুকোষ যত বেশি সক্রিয় হয়, পরবর্তী সময়ে সেই ছবি মনে রাখার সম্ভাবনাও তত বাড়ে। অর্থাৎ, কোনও অভিজ্ঞতা প্রথমবার দেখার সময়ই মস্তিষ্কের এই স্নায়ুকোষগুলির কার্যকলাপ থেকে বোঝা সম্ভব, সেটি ভবিষ্যতে মনে থাকবে কি না।
গবেষণাটির বিবরণ সবিস্তারে প্রকাশিত হয়েছে নেচার নিউরোসায়েন্স পত্রিকায়। গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কারকে কেন্দ্র করে আলঝাইমার্স রোগ এবং টেম্পোরাল লোব এপিলেপসি প্রভৃতি অসুখে স্মৃতিশক্তি হ্রাসের কারণ বোঝার একটা যোগসূত্র তৈরি করা যেতে পারে। অ্যামিগডালার স্বাভাবিক কার্যকলাপ ব্যাহত হলে স্মৃতি তৈরির প্রক্রিয়াতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভবিষ্যতে এই অংশের স্নায়ুকোষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে স্মৃতিজনিত সমস্যার চিকিৎসার নতুন পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হতেই পারে।
তবে শুধু ছবি নয়, শব্দ বা গন্ধের মতো অন্যান্য ইন্দ্রিয়-অভিজ্ঞতার স্মৃতি তৈরিতেও অ্যামিগডালা একইভাবে কাজ করে কি না, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। নিঃসন্দেহে এই আবিষ্কার মানুষের স্মৃতি তৈরির জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন দিশা দেখাল।
সূত্র: Xiao J, Daume J, Salimpour Y, et al. Stimulus-specific recruitment of human amygdala neurons predicts episodic memory encoding success. Nat Neurosci. 2026. doi: 10.1038/s41593-026-02493-9
