সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা ভারত মহাসাগরের তলদেশে এক আবিষ্কারের মাধ্যমে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান ও বিবর্তন গবেষণায় নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন । গবেষকেরা দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের ডায়ামান্টিনা অঞ্চলে (দক্ষিণ-পূর্ব ভারত মহাসাগরের সমুদ্রতলের একটি বিশেষ অঞ্চল, যা বিভিন্ন শৈলশিরা এবং গভীর খাত নিয়ে গঠিত) একটি বিশাল ও প্রাচীন তিমির কবরস্থান খুঁজে পেয়েছেন। এটির বয়স প্রায় ৫.৩ মিলিয়ন বছর, অর্থাৎ এটি প্লায়োসিন যুগের শুরু থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত তিমির বিবর্তন ও গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বহন করে।
সাধারণত কোনো তিমি মারা গেলে তার দেহ কিছু সময় সমুদ্রপৃষ্ঠে ভেসে থাকে। এ সময় হাঙর ও অন্যান্য শিকারি প্রাণী মৃতদেহ থেকে খাদ্য সংগ্রহ করে। পরে দেহটি ধীরে ধীরে সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যায়। সেখানে গভীর সমুদ্রের নানা জীব মৃতদেহকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘হোয়েল ফল’ বলে থাকেন। তবে এমন ঘটনার জীবাশ্ম খতিয়ান খুবই বিরল এবং বিচ্ছিন্ন।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চীনা বিজ্ঞান একাডেমির গবেষক শিয়াওতং পেং-এর নেতৃত্বে একটি দল ‘ফেনদৌঝে’ নামক গভীর সমুদ্রগামী ‘সাবমার্সিবল’ জাহাজ ব্যবহার করে সমুদ্রতলে অনুসন্ধান চালায়। প্রথম অভিযানে তাঁরা সমুদ্রের তলদেশে আংশিকভাবে পলির নীচে চাপা পড়া বহু তিমির কঙ্কাল ও জীবাশ্ম দেখতে পান। এরপর এক মাসে আরও ৩২টি ডুব অভিযান পরিচালনা করে তারা পুরো এলাকার মানচিত্র তৈরি করেন। গবেষণায় দেখা যায়, এই কবরস্থানটি সমুদ্রতলের প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত এবং এর গভীরতা ৪,২০০ থেকে ৭,০০০ মিটার পর্যন্ত। এখানে মোট ৪৭৬টি তিমির জীবাশ্ম এবং ৫টি সক্রিয় ‘হোয়েল ফল’ শনাক্ত করা হয়েছে। সক্রিয় হোয়েল ফলগুলোর চারপাশে জেলিফিশ, ব্রিটল স্টার, অস্থি-ভেদকারী কৃমি এবং আরও অনেক অদ্ভুত আকৃতির প্রাণীর সমাবেশ দেখা গেছে। গবেষকদের ধারণা, এদের অনেকগুলোই হয়তো বিজ্ঞানের কাছে সম্পূর্ণ নতুন প্রজাতি।
উদ্ধার করা ৪৩টি জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা পাঁচটি ঠোঁটওয়ালা তিমি প্রজাতি এবং একটি বেলিন তিমি প্রজাতি শনাক্ত করেন। এছাড়া তারা Pterocetus diamantinae নামে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও বর্তমানে বিলুপ্ত তিমি প্রজাতির সন্ধান পান। সবচেয়ে বড় নমুনাটি ছিল একটি মৃত অ্যান্টার্কটিক মিনকে তিমি, যার দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ মিটার।
রেডিওঅ্যাকটিভ আইসোটোপ দিয়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেন যে এখানকার প্রাচীনতম জীবাশ্মটির বয়স প্রায় ৫.৩ মিলিয়ন বছর। এত বিপুল সংখ্যক তিমির অবশেষ কেন একই অঞ্চলে জমা হয়েছে, সে প্রশ্নের উত্তরে গবেষকেরা ধারণা করেন যে ডায়ামান্টিনা জোনের ভি-আকৃতির ভূ-প্রকৃতি মৃত তিমির দেহগুলোকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে জমা হতে সাহায্য করেছে। একই সঙ্গে এই এলাকায় গভীর জলের ঠোঁটওয়ালা তিমির আধিক্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই আবিষ্কার তিমির মৃত্যুর পর গড়ে ওঠা গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি, প্লায়োসিন যুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিমির বিবর্তনের ইতিহাস জানার একটি বিরল সুযোগও করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর গভীর সমুদ্র এখনও অনেকটাই অজানা। মানবজাতি যত অনুসন্ধান চালাচ্ছে, ততই নতুন নতুন বিস্ময় উন্মোচিত হচ্ছে। ভারত মহাসাগরের এই ৫.৩ মিলিয়ন বছরের পুরোনো তিমির কবরস্থান সেই অজানা গভীর জগতকে নিয়ে ভবিষ্যতে গবেষণার এক অমূল্য সম্পদ।
সূত্র: A 5.3 million year old whale graveyard has been found on the floor of the Indian Ocean
Published: June 11, 2026 12.52am BST
