অকরুণ আবহাওয়াতেও মানুষের অভিযোজন

অকরুণ আবহাওয়াতেও মানুষের অভিযোজন

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ৩১ মে, ২০২৬

খরা এল, বৃষ্টি কমল, আর মানুষ এলাকা ছেড়ে চলে গেল। জনশূন্য বসতি, ভেঙে পড়া শহর কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়া বাণিজ্যপথের পিছনে দায়ী জলবায়ুর পরিবর্তনই। প্রাচীনকাল থেকে এমন ধারণাই করা হত। কিন্তু ইজরায়েলের কারমেল উপকূলে পাওয়া নতুন এক তথ্য সেই ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হাজার হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে জলবায়ু বারবার চরম আর্দ্রতা ও শুষ্ক অবস্থার মধ্যে দুলেছে। অথচ মানুষ সেখান থেকে পালিয়ে যায়নি। বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েই বেঁচে ছিল। এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান ডিয়েগোর গবেষক গিলাদ শ্টেইনবার্গ। তাঁরা কারমেল উপকূলের জলাভূমি থেকে প্রায় ৫০ ফুট গভীর পর্যন্ত কাদামাটির স্তর সংগ্রহ করেন। হাজার বছরের জমে থাকা এই স্তরগুলির ভিতরে লুকিয়ে ছিল অতীতের পরিবেশের নানা চিহ্ন। মিষ্টি জলের শামুক ও ঝিনুক জানান দেয়, কোন সময়ে জলাভূমি সমৃদ্ধ ছিল। আবার লবণ সহ্য করতে পারে এমন প্রাণীর উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছিল শুষ্ক সময়ের। পরাগরেণু থেকে বোঝা গিয়েছে আশপাশে কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মাত, আর কাঠকয়লার চিহ্ন জানিয়েছে ক্ষয় ও বন্যার ইতিহাস। এই তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁরা দেখেন, জলবায়ুর পরিবর্তন মোটেও ধীর বা মসৃণ ছিল না। কয়েক দশক বা এক-দু’শো বছরের মধ্যেই ভেজা আবহাওয়া হঠাৎ খরায় বদলে যেত। অর্থাৎ একটি প্রজন্ম সবুজ পরিবেশে বড় হয়েছে, আর পরের প্রজন্ম নিজের জীবনেই সেই অঞ্চল শুকিয়ে যেতে দেখেছে। প্রায় ৮ হাজার বছরের জলবায়ুর ইতিহাস এই গবেষণায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে ৭,৮০০ থেকে ৭,৬০০ বছর আগে অঞ্চলটি অত্যন্ত আর্দ্র ছিল। এরপর শুরু হয় ধীরে ধীরে শুষ্কতার দিকে যাত্রা, যা ‘আফ্রিকান হিউমিড পিরিয়ড’-এর অবসানের অংশ। সেই সময় উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল আজকের তুলনায় অনেক বেশি সবুজ ছিল। প্রায় ৪,২০০ বছর আগে ভয়াবহ খরার একটি পর্বও ধরা পড়েছে এই স্তরে। ইতিহাসে এই সময়কে মেসোপটেমিয়া থেকে মিশরের পুরনো রাজত্ব পর্যন্ত বহু সভ্যতার সংকটের সময় হিসেবে ধরা হয়। তখন ফসল নষ্ট হয়েছিল, বসতি পরিত্যক্ত হয়েছিল, শহুরে কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে খরা মানেই মানুষের পালানো নয়। প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যের সঙ্গে জলবায়ুর রেকর্ড মিলিয়ে গবেষকরা দেখেছেন, মানুষ বরং নতুন উপায়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করেছিল। এই সময়েই দেখা যায় ‘ফ্লাডওয়াটার ফার্মিং’ বা বন্যার জল ধরে চাষের পদ্ধতি। ছোট পাথরের বাঁধ ও ধাপ তৈরি করে বৃষ্টির জল ধরে রাখা হত, যাতে খরার সময়েও চাষ চালানো যায়। পশুপালনের ধরনেও পরিবর্তন আসে। ভেড়া ও ছাগল পালনের পদ্ধতি বদলে অনিশ্চিত আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়।গবেষকদের মতে, দক্ষিণ লেভান্ট অঞ্চলের মানুষ খরার মুখে এলাকা ছেড়ে যায়নি, বরং নিজেদের জীবনযাত্রা বদলে নিয়েছিল। এমনকি তারা আরও শুষ্ক এলাকাতেও বসতি গড়ে তুলেছিল। সুতরাং এখন আর শুধু শুকনো মাটির স্তর দেখেই সভ্যতার পতনের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। বরং বোঝা যাচ্ছে, অতীতের মানুষ জলবায়ুর পরিবর্তনের মুখেও অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা দেখিয়েছে।

 

সূত্র: Early to mid-Holocene climate oscillations and cultural shifts in the eastern Mediterranean ; Science Direct ; May ; 2026

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twenty − 11 =