অক্টোপাসের অনন্য আণবিক কৌশল

অক্টোপাসের অনন্য আণবিক কৌশল

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১৬ জুলাই, ২০২৬

অক্টোপাসকে পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের একটি হিসেবে ধরা হয়। অক্টোপাসের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং পরিবেশের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়। এবার সেই বিস্ময়ের তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। সম্প্রতি গবেষকেরা অক্টোপাসের শরীরে এমন এক বিরল আণবিক বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পেয়েছেন, যা এখন পর্যন্ত পৃথিবীর অন্য কোনো পরিচিত জীবের মধ্যে দেখা যায়নি। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে অগভীর সমুদ্রের কিছু অক্টোপাস অত্যন্ত নির্ভুলভাবে প্রোটিন তৈরি করতে পারে। ফলে ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিন তৈরির হার কমে যায় এবং কোষে ক্ষতিকর প্রোটিন জমাট বাঁধার ঝুঁকিও হ্রাস পায়। গবেষণাটি বায়োরিক্সিভে প্রকাশিত হয়েছে এবং শীঘ্রই কারেন্ট বায়োলজি পত্রিকাতে প্রকাশিত হবে।

সাধারণভাবে সব জীবের কোষের ডিএনএ-তে থাকা তথ্য প্রথমে মেসেঞ্জার আরএনএ (mRNA)-তে কপি হয়। এরপর রাইবোসোম সেই নির্দেশনা অনুযায়ী একের পর এক অ্যামিনো অ্যাসিড জুড়ে প্রোটিন তৈরি করে। রাইবোসোমের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো রাইবোসোমাল আরএনএ (rRNA), যার গঠন কোটি কোটি বছর ধরে প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

কিন্তু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা অক্টোপাস বিমাকিউলয়ডিস প্রজাতির আরএনএ পরীক্ষা করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ্য করেন। তারা দেখেন, রাইবোসোমাল আরএনএ একটি নির্দিষ্ট স্থানে দুটি অংশে ভেঙে যায়। যদিও এই দুটি অংশ আলাদা থাকে, তবুও তারা একসঙ্গে কাজ করে স্বাভাবিকভাবে প্রোটিন তৈরি করতে সক্ষম।

গবেষকেরা এই পরিবর্তনটি এসচেরিচিয়া কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে কৃত্রিমভাবে যুক্ত করেন। দেখা যায়, পরিবর্তিত রাইবোসোম স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম ভুল করে প্রোটিন তৈরি করছে। এই প্রক্রিয়া কিছুটা ধীর, কিন্তু অনেক বেশি নির্ভুল। ফলে ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিন তৈরি কম হয় এবং কোষে বিষাক্ত প্রোটিন জমাট বাঁধার ঝুঁকিও কমে যায়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হলো, অক্টোপাসের এই বিশেষ রাইবোসোমটি সম্পাদিত mRNA থেকেও সহজে সঠিক প্রোটিন তৈরি করতে পারে। সেফালোপড প্রাণীরা, বিশেষ করে অক্টোপাস, অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি mRNA সম্পাদনা করে। এতে নতুন বৈশিষ্ট্যের প্রোটিন তৈরি হতে পারে, যা তাদের ঠান্ডা জলে ভালোভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেয়। কিন্তু এ ধরনের সম্পাদিত mRNA থেকে ভুল প্রোটিন তৈরির ঝুঁকিও বেশি থাকে। স্তন্যপায়ী প্রাণীর রাইবোসোম এ ধরনের mRNA প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে প্রায়ই সমস্যায় পড়ে, অথচ অক্টোপাসের রাইবোসোম তা দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে পারে।

গবেষকেরা ১৫টি অগভীর সমুদ্রের অক্টোপাস প্রজাতিতে এই বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। তবে গভীর সমুদ্র নিবাসী ১২টি প্রজাতির মধ্যে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তাঁদের ধারণা, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে অগভীর সমুদ্রনিবাসী অক্টোপাসের পূর্বপুরুষদের মধ্যে এই আণবিক পরিবর্তনের উদ্ভব ঘটে। ঠিক সেই সময় থেকেই তাদের স্নায়ুতন্ত্র দ্রুত জটিল হতে শুরু করে এবং শিকার ধরা, সরঞ্জাম ব্যবহার, সমস্যা সমাধান ও শত্রুকে ফাঁকি দেওয়ার মতো উন্নত আচরণের বিকাশ ঘটে। যদিও এই আণবিক পরিবর্তন এবং মস্তিষ্কের বিবর্তনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক এখনও প্রমাণিত নয়, তবু গবেষকদের ধারণা, আরও নির্ভুলভাবে প্রোটিন তৈরির ক্ষমতা হয়তো স্নায়ুকোষকে দীর্ঘদিন সুস্থ ও কার্যকর রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার অক্টোপাসের বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার পাশাপাশি, ভবিষ্যতের জিন প্রকৌশল, আরএনএ-ভিত্তিক চিকিৎসা এবং প্রোটিন প্রকৌশলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। রাইবোসোমের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে যদি আরও নির্ভুলভাবে প্রোটিন তৈরি করা সম্ভব হয়, তবে আলঝেইমার, পারকিনসনসহ ত্রুটিপূর্ণ প্রোটিন জমাট বাঁধার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে এই গবেষণা আবারও প্রমাণ করল, প্রচলিত পরীক্ষাগারের প্রাণীর বাইরে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় জীবজগতের মধ্যে এমন বহু অজানা রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যতের জীববিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটা বড়োমাপের পরিবর্তনের পথ দেখাতে পারে।

সূত্র: doi: 10.1126/science.zgzu9u6

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nineteen − seventeen =