অতিনিদ্রা রোগের মূল জৈবিক কারণ 

অতিনিদ্রা রোগের মূল জৈবিক কারণ 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৭ আগষ্ট, ২০২৬

নার্কোলেপসি সাধারণত অতিরিক্ত ঘুম পাওয়ার একটি স্নায়বিক রোগের প্রধান লক্ষণ। যার ফলে দিনের বেলায় অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব, রাতে জেগে থাকা, নিদ্রা পক্ষাঘাত, অলীকদর্শন এবং অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ পেশিশক্তি হারিয়ে পড়ে যাওয়া বা ক্যাটাপ্লেক্সি সমস্যা দেখা যায়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। এত দিন পর্যন্ত চিকিৎসার মূল লক্ষ্য ছিল উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু এবার সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) নার্কোলেপসির মূল জৈবিক কারণকে লক্ষ্য করে তৈরি প্রথম ওষুধ ওভেপোরেক্সটন (Orzeyful) অনুমোদন করেছে। নতুন এই ওষুধটি ওরেক্সিন অ্যাগোনিস্ট শ্রেণির। এই ওষুধের বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু রোগের উপসর্গ কমায় না; বরং মস্তিষ্কের যে রাসায়নিক ব্যবস্থার ঘাটতি নার্কোলেপসি সৃষ্টি করে, সেটিকেই পুনরায় সক্রিয় করার চেষ্টা করে।

১৯৯০-এর দশকের শেষদিকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন, টাইপ-১ নার্কোলেপসিতে আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কে ওরেক্সিন নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ নিউরোপেপটাইড প্রায় অনুপস্থিত। হাইপোথ্যালামাসের প্রায় ৭০ হাজার স্নায়ুকোষ এই রাসায়নিক তৈরি করে। এসব কোষ নষ্ট হয়ে গেলে ওরেক্সিনের ঘাটতি দেখা দেয় এবং মস্তিষ্কের ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়। ফলে মানুষ দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পড়ে, আর নিশাচর প্রাণীদের মতো রাতে জেগে থাকে। টাইপ-২ নার্কোলেপসির ক্ষেত্রে অবশ্য ওরেক্সিনের ঘাটতির সম্পর্ক স্পষ্ট নয়।

এই বৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ওষুধটি তৈরি করেছে Takeda Pharmaceuticals। ২০১১ সালে গবেষকেরা এমন একটি রাসায়নিক যৌগ শনাক্ত করেন, যা ওরেক্সিনের মতো কাজ করতে পারে। এটি মস্তিষ্কের ওরেক্সিন গ্রাহী কোষকে সক্রিয় করে ঘুম-জাগরণ বর্তনীকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।

পরবর্তী পর্যায়ে ২৭৩ জন টাইপ-১ নার্কোলেপসি রোগীকে নিয়ে দুটি তৃতীয়-পর্বের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়। দিনে দু’বার ওষুধ গ্রহণকারী রোগীরা দিনের বেলায় বেশি সময় জেগে থাকতে এবং রাতে সহজে ঘুমাতে ও ঘুমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হন। ফলে ক্যাটাপ্লেক্সি, নিদ্রা পক্ষাঘাত এবং হ্যালুসিনেশনের মতো উপসর্গও কমে আসে।

গবেষকদের কাছে এই সাফল্যের গুরুত্ব আরও বড়। কারণ, ওরেক্সিন-ভিত্তিক চিকিৎসা ভবিষ্যতে শুধু নার্কোলেপসি নয়, অন্যান্য ঘুমের সমস্যা এবং কিছু স্নায়ু মনোরোগের চিকিৎসার নতুন পথও খুলে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের উপসর্গনির্ভর চিকিৎসা থেকে সরে গিয়ে মস্তিষ্কের রোগের মূল জৈবিক কারণকে লক্ষ্য করে চিকিৎসা চালানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

সুত্র: doi: https://doi.org/10.1038/d41586-026-02552-y

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − four =