এই মুহূর্তে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে কোটি কোটি অদৃশ্য কণা ছুটে যাচ্ছে। আমরা সেগুলিকে অনুভবও করতে পারি না। এই কণাগুলির নাম অ্যান্টিনিউট্রিনো। ডাকনাম,”ভূতুড়ে কণা”। সম্প্রতি কানাডার একদল বিজ্ঞানী এই ভূতুড়ে কণাকে ঘিরেই এমন এক সাফল্য পেয়েছেন, যা ভবিষ্যতের বিজ্ঞান গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কানাডার অন্টারিও প্রদেশে, মাটির প্রায় দুই কিলোমিটার নীচে অবস্থিত একটি গবেষণাগারে তাঁরা প্রথমবার শুধুমাত্র বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করে ১৫০ মাইলেরও বেশি দূরে থাকা একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা অ্যান্টিনিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রশ্ন হল, অ্যান্টিনিউট্রিনো আসলে কী? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যখন শক্তি উৎপাদনের জন্য নিউক্লীয় বিভাজন ঘটে, তখন বিপুল সংখ্যায় অ্যান্টিনিউট্রিনো তৈরি হয়। কিন্তু এই কণাগুলি এতটাই ক্ষুদ্র এবং এত কম বিক্রিয়াশীল যে তারা প্রায় সবকিছুর ভেতর দিয়েই বাধাহীনভাবে চলে যেতে পারে। প্রতি সেকেন্ডে লক্ষ-কোটি অ্যান্টিনিউট্রিনো আমাদের শরীর, পৃথিবী এবং মহাকাশ অতিক্রম করে যায়, কিন্তু আমরা তাদের অস্তিত্ব টের পাই না। তাহলে বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই “অদৃশ্য” কণার সন্ধান পেলেন? এর জন্য তাঁরা ব্যবহার করেছেন কানাডার সাডবেরিতে অবস্থিত এসএনও+ (SNO+) নামের একটি অত্যাধুনিক ডিটেক্টর। গবেষণাগারটিকে মাটির গভীরে তৈরি করা হয়েছে, যাতে মহাকাশ থেকে আসা অন্যান্য বিকিরণ পরীক্ষায় বাধা সৃষ্টি করতে না পারে। ২০১৮ সালে একটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ডিটেক্টরটিতে বিশেষ তরলের পরিবর্তে অত্যন্ত বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করা হয়েছিল। আর তখনই ঘটে যায় সেই চমকপ্রদ ঘটনা। দূরবর্তী একটি পারমাণবিক চুল্লি থেকে আসা একটি অ্যান্টিনিউট্রিনো ডিটেক্টরের ভেতরে থাকা একটি প্রোটনের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানীরা বলেন “ইনভার্স বিটা ডিকে”। সংঘর্ষের ফলে একটি পজিট্রন এবং একটি নিউট্রন তৈরি হয়। আর পজিট্রনটি জলের মধ্যে চলার সময় এক ক্ষীণ নীল আলোর ঝলক সৃষ্টি করে, যাকে বলা হয় “চেরেনকভ বিকিরণ”। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, বিজ্ঞানীরা সেই ক্ষণিকের নীল আলোর ঝলকটিকেই ধরে ফেলেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তথ্য বিশ্লেষণ করার পর গবেষকরা প্রায় ৯৯.৭ শতাংশ নিশ্চিত হয়েছেন যে এই সংকেতটি সত্যিই দূরবর্তী পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা অ্যান্টিনিউট্রিনোর কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? কারণ, এতদিন অ্যান্টিনিউট্রিনো শনাক্ত করতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হতো। এখন যদি শুধুমাত্র বিশুদ্ধ জল ব্যবহার করেই এই কণাগুলিকে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে ভবিষ্যতে কম খরচে আরও উন্নত ডিটেক্টর তৈরি করা যাবে। এর ফলে শুধু মহাবিশ্বের রহস্য অনুসন্ধানই নয়, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।
সূত্র: ScienceAlert / Physical Review Letters, via Yahoo News article by Michelle Starr, July 1, 2026.
