অব্যবহৃত শুক্রাণুর পরিণতি 

অব্যবহৃত শুক্রাণুর পরিণতি 

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ২৬ জুলাই, ২০২৬

মানবদেহের প্রতিটি অঙ্গের মতোই পুরুষ প্রজননতন্ত্রও অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও দক্ষভাবে কাজ করে। অনেকের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন জাগে—যদি দীর্ঘদিন বীর্যপাত না হয়, তাহলে শরীরে তৈরি হওয়া কোটি কোটি শুক্রাণুর কী হয়? সেগুলো কি জমে থাকে, নাকি প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে?

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা সম্পূর্ন ভুল। মানবদেহ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পুরোনো ও অব্যবহৃত শুক্রাণুকে অপসারণ এবং পুনর্ব্যবহার করে।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর থেকে অণ্ডকোষে সারাজীবনই নতুন শুক্রাণু তৈরি হতে থাকে। শুক্রাণু তৈরির এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় স্পার্মাটোজেনেসিস। এই প্রক্রিয়াটি অণ্ডকোষের সেমিনিফেরাস টিউবিউলস নামের সূক্ষ্ম নালিকায় ঘটে। স্টেম সেল থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ শুক্রাণু তৈরি হতে সাধারণত ৬৪ থেকে ৭৪ দিন সময় লাগে। এরপর শুক্রাণুগুলো এপিডিডাইমিসে পৌঁছে আরও পরিণত হয় এবং কিছু সময়ের জন্য সেখানে সঞ্চিত থাকে।

তবে সব শুক্রাণু বীর্যপাতের মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায় না। যেসব শুক্রাণু ব্যবহার হয় না, সেগুলো নির্দিষ্ট সময় পর স্বাভাবিকভাবেই কার্যক্ষমতা হারায়। সাধারণত প্রায় আড়াই মাস পর পুরোনো শুক্রাণু শরীরের জন্য আর উপযোগী থাকে না। তখন দেহ একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেগুলোকে অপসারণ করে।

এই প্রক্রিয়ার নাম অ্যাপোপটোসিস বা পরিকল্পিত কোষ মৃত্যু (প্রোগ্রামড সেল ডেথ)। এতে পুরোনো শুক্রাণুগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে যায়। এরপর ম্যাক্রোফেজ নামক বিশেষ প্রতিরক্ষা কোষ সেই ভাঙা অংশগুলোকে গ্রাস করে ক্ষুদ্রতর উপাদানে পরিণত করে। এইসব উপাদানের মধ্যে থাকে প্রোটিন, চর্বি, অ্যামাইনো অ্যাসিড, জিঙ্কসহ নানা পুষ্টি উপাদান।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, শরীর এসব মূল্যবান উপাদান নষ্ট করে না। প্রজননতন্ত্রের আবরণী কোষ এগুলো পুনরায় শোষণ করে রক্তপ্রবাহে ফিরিয়ে দেয়। পরে শরীর সেগুলো নতুন কোষ তৈরি, কোষকলার মেরামত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজে ব্যবহার করে। অর্থাৎ, অব্যবহৃত শুক্রাণুও শরীরের হিতর্থেই ব্যবহৃত হয়।

একইভাবে বীর্যের অতিরিক্ত তরল অংশেরও কিছু অংশ পুনরায় শোষিত হয় এবং বাকি অংশ স্বাভাবিক উপায়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। ফলে বীর্যপাত না হলেও শরীরে কোনো চাপ সৃষ্টি হয় না বা শুক্রাণু অনির্দিষ্টকাল জমে থাকে না।

এই পুরো প্রক্রিয়া মানবদেহের অসাধারণ কর্মদক্ষতার একটি অনন্য উদাহরণ। পুরোনো শুক্রাণুকে নিরাপদে ভেঙে তার উপাদান পুনর্ব্যবহার করার মাধ্যমে শরীর সবসময় নতুন, সুস্থ ও কার্যক্ষম শুক্রাণু উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত থাকে। তাই অব্যবহৃত শুক্রাণু নিয়ে অযথা উদ্বেগ অর্থহীন। এটি মানবদেহের স্বাভাবিক ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি প্রক্রিয়া।

 

 

সূত্র: Cleveland Clinic – “Sperm: Cells, How Long It Lives, Anatomy & Function”.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + six =