অমরত্ব, না সুস্থ সক্রিয় বার্ধক্য? 

অমরত্ব, না সুস্থ সক্রিয় বার্ধক্য? 

অঙ্কিতা গাঙ্গুলী
বিজ্ঞানভাষ সম্পাদকীয় বিভাগ
Posted on ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সময় সবার জন্য একই গতিতে এগোয়, কিন্তু আয়ু তো তা নয়। সেকারণেই, কোনো প্রাণী বাঁচে কয়েক দিন, কেউ আবার কয়েক হাজার বছর। কেউ দ্রুত ক্ষয়ে যায়, কেউ যেন সময়কেই হার মানায়। প্রকৃতিতে আয়ুর এই বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের সঙ্গে বিপাকক্রিয়ার সম্পর্ক গভীর। সাধারণত ছোট প্রাণীদের বিপাকের হার বেশি এবং জীবনকাল তুলনামূলকভাবে কম। বড় প্রাণীদের বিপাক ধীর, আয়ু দীর্ঘ। কিন্তু এই নিয়মের মধ্যেও রয়েছে অদ্ভুত সব ব্যতিক্রম। গভীর সমুদ্রবাসী হেক্স্যাক্টিনেলিড বা কাচের স্পঞ্জ-এর আয়ু প্রায় ১৫ হাজার বছর! তাই দীর্ঘায়ুর রহস্য কেবল শরীরের আকারে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোষ, জিন, বিপাক এবং শরীরের ক্ষয় মেরামতের জটিল প্রক্রিয়া।

 

গত দেড়শো বছরে মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। উন্নত জনস্বাস্থ্য, পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা, টিকাকরণ এবং আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার বিস্তার মানুষকে আগের তুলনায় অনেক বেশি দিন বাঁচার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু গড় আয়ু বাড়া আর মানুষের সর্বোচ্চ আয়ুর সীমা ভেঙে দেওয়া এক বিষয় নয়। এখনও পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে দীর্ঘ মানবজীবনের রেকর্ড ফরাসি নারী জাঁ কালমাঁ-র। তিনি ১২২ বছর বয়সে ১৯৯৭ সালে মারা যান। তারপর আর কেউ ১২০ বছর অতিক্রম করতে পারেননি। এর অর্থ এই নয় যে ১২২ বছরই মানুষের চূড়ান্ত সীমা; তবে বর্তমান জৈবিক কাঠামোয় সেই সীমা অতিক্রম করা অত্যন্ত কঠিন বলেই মনে হয়।

অন্যদিকে, দীর্ঘায়ুর আরেকটি ছবি ফুটে উঠছে জাপানে। সেখানে বর্তমানে এক লক্ষেরও বেশি মানুষ শতাধিক বছর বয়সী। তাই ভবিষ্যতের লক্ষ্য হয়তো শুধু নতুন সর্বোচ্চ বয়সের রেকর্ড তৈরি করা নয়; বরং আরও বেশি মানুষকে দীর্ঘ সময় সুস্থ, সক্রিয় ও স্বাধীনভাবে বাঁচিয়ে রাখা।

 

বার্ধক্যকে শুধু মুখের বলিরেখা দিয়ে বোঝা যায় না। সময়ের সঙ্গে শরীরের ভিতরেও ঘটে বিস্তর পরিবর্তন। পেশির ভর কমে যায়, শক্তি ও ভারসাম্য নষ্ট হয়, চলাফেরা কঠিন হয়ে ওঠে। ক্লান্তি বাড়ে এবং দৈনন্দিন কাজও ধীরে ধীরে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়। মস্তিষ্কেও বয়সের প্রভাব পড়ে, বোধবুধিগত ক্ষমতার অবনতি ঘটতে পারে।

এর নেপথ্যে রয়েছে একাধিক আণবিক পরিবর্তন। ডিএনএ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রোটিনের গুণমান ও সঠিক বণ্টন ব্যাহত হয়, কোষের শক্তি উৎপাদনকারী মাইটোকন্ড্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। পুষ্টি ও বাইরের সংকেতের প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়াও কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বাড়ে এবং টিস্যু মেরামত ও পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেম সেলের সংখ্যা কমতে থাকে। অর্থাৎ বার্ধক্য কোনও একক ত্রুটির ফল নয়; এটি শরীরের বহু ব্যবস্থায় দীর্ঘ-সঞ্চিত ক্ষয়ের সম্মিলিত পরিণতি।

 

বিজ্ঞানীরা তাই খুঁজছেন এমন পদ্ধতি, যা এই ক্ষয়ের গতি কমাতে পারে। প্রাণীদের ওপর গবেষণায় ক্যালরি-নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য ফল দেখিয়েছে। প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় রেখেও কম ক্যালরি গ্রহণ করলে কিছু প্রাণীর স্বাস্থ্য ভালো থাকে, আয়ু বাড়ে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যালরি-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সারাক্ষণ ক্ষুধা, ঠান্ডার প্রতি স্পর্শকাতরতা, ক্ষত সারতে দেরি হওয়া এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে আরেকটি বহুল আলোচিত গবেষণাক্ষেত্র হলো ‘প্যারাবায়োসিস’। এখানে দুটি ইঁদুরের রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, বয়স্ক ইঁদুর তরুণ ইঁদুরের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের আয়ু ও কিছু শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এই ফলাফল থেকে আবার তরুণ মানুষের রক্তরস ব্যবহারের নানা বাণিজ্যিক উদ্যোগের জন্ম হয়েছে। কিন্তু মানুষের বার্ধক্য ধীর করার ক্ষেত্রে এমন চিকিৎসার কার্যকারিতার পক্ষে এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবে এই গবেষণা রক্তে বয়সের সঙ্গে পরিবর্তিত এমন কিছু উপাদান খুঁজতে উৎসাহিত করেছে বিজ্ঞানীদের, যা হয়তো ভবিষ্যতে চিকিৎসায় কাজে লাগতে পারে।

 

দীর্ঘায়ু অর্জন সংক্রান্ত গবেষণার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায়গুলির একটি এসেছে কোষের পুনঃ-প্রোগ্রামিং থেকে। ২০০৬ সালে জাপানি বিজ্ঞানী শিনিয়া ইয়ামানাকা দেখান, মাত্র চারটি নির্দিষ্ট জিন সক্রিয় করেই পরিণত কোষকে বহুমুখী স্টেম কোষের মতো অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায়। এই ‘ইয়ামানাকা ফ্যাক্টর’ কোষকে অনেকটা পুরোনো ভ্রূণীয় অবস্থার দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে। প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে কিছু টিস্যুর কার্যকারিতার উন্নতি এবং জৈবিক বয়সের কিছু সূচক হ্রাসের প্রমাণ পাওয়া গেছে। কিন্তু মানুষের শরীরে একই কৌশল প্রয়োগ এখনও খুব জটিল। কোষের পরিচয়, নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা বজায় রাখা— এ সবই বড় চ্যালেঞ্জ।

 

মানুষের অমরত্বের স্বপ্ন যতই আকর্ষণীয় হোক, বর্তমান বিজ্ঞান এখনও সেখানে পৌঁছায়নি। বরং দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল – জীবনের কটা বছর বেশি পেলাম সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, সুস্থ জীবনকাল বাড়ানোই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ভেঙ্কি রামাকৃষ্ণনের কথায়, সুস্থ বার্ধক্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি এখনও অত্যন্ত পরিচিত— ভালো খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম। সেই সঙ্গে সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং জীবনের একটা উদ্দেশ্যবোধ।

 

অর্থাৎ মানুষের অমরত্বের সন্ধানের চেয়ে বিজ্ঞান আপাতত যে প্রশ্নটির উত্তর খুঁজছে, তা আরও বাস্তব – জীবনের শেষ সীমা বদলানোর চেষ্টা না করে, সেই সীমা পর্যন্ত আরও সুস্থ ও সক্রিয়ভাবে পৌঁছতে পারা।

 

সূত্র:Can humans live forever? | Scientific American https://share.google/J1WYaPC5Pz8Mm94Mk

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − five =