অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিশাল পলিনিয়া

অ্যান্টার্কটিকার বরফে বিশাল পলিনিয়া

বিজ্ঞানভাষ সংবাদদাতা
Posted on ১১ অক্টোবর, ২০২৬

শীতকালে অ্যান্টার্কটিকার সামুদ্রিক বরফ সাধারণত মহাদেশটিকে প্রায় অবিচ্ছিন্ন একটি হিমবেষ্টনীতে ঘিরে রাখে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার ব্রেইড বে-তে উপগ্রহ পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এক বিরল ও বিস্ময়কর ঘটনা। বরফের মাঝখানে সৃষ্টি হয়েছিল বিশাল এক উন্মুক্ত জলভাগ, যাকে বলা হয় পলিনিয়া। চারদিকে ভাসমান সামুদ্রিক বরফে ঘেরা এই জলভাগটির সর্বোচ্চ আয়তন পৌঁছেছিল ৮৯,১২১ বর্গকিলোমিটারে। এই আয়তন পোর্তুগালের মোট ভূখণ্ডের প্রায় সমান। ১৯৭৯ সালে নিয়মিত উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর থেকেও ওই অঞ্চলে বছরের ওই সময়ে এত বড় পলিনিয়া আর দেখা যায়নি।

ব্রেইড বে সাধারণত জুলাই ও আগস্টে ঘন বরফে ঢাকা থাকে। কিন্তু ২০২৪ সালের ঘটনাটির আগে থেকেই সেখানে বরফের ঘনত্ব দ্রুত কমতে শুরু করে। জুলাইয়ের শুরুতে সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ৯৬ শতাংশ বরফে আবৃত থাকলেও মাসের শেষে তা নেমে আসে ২৫ শতাংশের নীচে। এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল জলভাগটি গড়ে ওঠে।

জীবনজ্যোতি সোঁয়েনের নেতৃত্বে গবেষকরা দেখেছেন, বিরল কিছু বায়ুমণ্ডলীয় ও সামুদ্রিক পরিস্থিতির সমাপতনেই এই পলিনিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই ও আগস্টে ছয়টি শক্তিশালী বায়ুমণ্ডলীয় নদী নিম্ন অক্ষাংশ থেকে অ্যান্টার্কটিকার দিকে বিপুল পরিমাণ উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু পরিবহন করে। এগুলির কয়েকটি ছিল মধ্য-শীতকালে নথিভুক্ত সবচেয়ে শক্তিশালী আর্দ্রতা পরিবহনকারী ঘটনা।

এই বায়ুপ্রবাহের ফলে দীর্ঘতরঙ্গ বিকিরণ বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যায়। তুলনামূলক উষ্ণ তুষারপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠে অতিরিক্ত তাপের প্রবাহও বরফ গঠনে বাধা দেয়। পাশাপাশি প্রবল বাতাস সমুদ্রের বরফকে মেরুর দিকে সরিয়ে দেয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় একমান সাকশনের। যার ফলে সমুদ্রের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ গভীর জল ওপরের দিকে চক্রাকারে উঠে আসে। উষ্ণ জল ও বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতার সম্মিলিত প্রভাবে বরফের বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং উন্মুক্ত জলভাগ দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই ঘটনা ঘটেছে অ্যান্টার্কটিকার ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন শীতকালীন সামুদ্রিক বরফের বিস্তারের প্রেক্ষাপটে। রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে কম বরফ-বিস্তারের চারটি শীতই পড়েছে সাম্প্রতিক চার বছরে। গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলীয় নদীগুলি আরও শক্তিশালী হলে ভবিষ্যতে অ্যান্টার্কটিকার অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল এলাকাতেও এ ধরনের বৃহৎ পলিনিয়া আরও ঘন ঘন দেখা যেতে পারে। এই ঘটনা কোনো ব্যতিক্রমী প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি হয়তো পরিবর্তিত অ্যান্টার্কটিক জলবায়ুর একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

সূত্র: Swain, J. et al., Geophysical Research Letters, 10.1029/2026GL122580, 2026.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

9 + 7 =