পৃথিবীতে জীবনের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণা। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর সমস্ত জীবের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ প্রায় ৪২০ কোটি বছর আগে এসেছিল। পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪৫৪ কোটি বছর। অর্থাৎ গ্রহটি গঠিত হওয়ার মাত্র কয়েকশো মিলিয়ন বছরের মধ্যেই জীবনের প্রাথমিক রূপের আবির্ভাব ঘটে যায়। এই তথ্য বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতদিন ধারণা ছিল জটিল জীবনের পূর্বসূরি গড়ে উঠতে অনেক বেশি সময় লেগেছিল।
LUCA বা সকল জীবের সর্বশেষ সাধারণ পূর্বপুরুষ কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী বা উদ্ভিদ ছিল না। এটি ছিল একটি আদিম এককোষী জীব, যাকে পৃথিবীর সব জীবের সাধারণ পূর্বপুরুষ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে বিদ্যমান তিনটি প্রধান জীবগোষ্ঠী-ব্যাকটেরিয়া, আর্কিয়া এবং ইউক্যারিওট। এরা সবই এই আদিম জীব থেকে বিবর্তিত হয়েছে বলেই মনে করা হয়। এমনকি আধুনিক জীবের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে LUCA-এর সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেছেন গবেষকরা। ফলে যা পাওয়া গেল, তা একটি প্রোক্যারিওট ধরনের অণুজীব। এর কোষে কোনো সুগঠিত নিউক্লিয়াস ছিল না। ধারণা করা হয়, অক্সিজেনবিহীন পরিবেশে এরা বেঁচে থাকত। শক্তি উৎপাদনের জন্য এরা হাইড্রোজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করত। সুতরাং LUCA মোটেও খুব সাধারণ জীব ছিল না। এর জিনোমে প্রায় ২,৬০০ ধরনের প্রোটিন তৈরির নির্দেশনা পাওয়া যায়। এই সংখ্যা বর্তমানের অনেক ব্যাকটেরিয়ার জিনগত জটিলতার সঙ্গে তুলনীয়। এমনকি ভাইরাসের আক্রমণ প্রতিরোধ হয়তো এরই প্রাথমিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে এসেছে। এই গবেষণা বলছে, পৃথিবীতে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি হওয়ার পর জীবন অত্যন্ত দ্রুত বিকশিত হয়েছিল। অনেক বিজ্ঞানীর ধারণা, সমুদ্রের তলদেশে অবস্থিত উষ্ণ হাইড্রোথার্মাল নির্গমন পথ বা অনুরূপ পরিবেশে জীবনের সূচনা ঘটে থাকতে পারে। সেখানে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে প্রথম জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। LUCA-র সময় পৃথিবী ছিল আজকের তুলনায় অনেক প্রতিকূল। সে সময় “লেট হেভি বোম্বার্ডমেন্ট” নামে পরিচিত এক পর্যায়ে পৃথিবীতে ঘন ঘন উল্কাপিণ্ড আঘাত হানত। তবুও এই কঠিন পরিবেশে আদিম জীব টিকে থাকতে এবং বিকশিত হতে সক্ষম হয়েছিল। এ থেকে প্রমাণ হয় যে জীবনের প্রাথমিক রূপ অত্যন্ত সহনশীল ছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই আবিষ্কার জীবনের উৎপত্তি বা অ্যাবায়োজেনেসিস সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। কারণ সাধারণ রাসায়নিক উপাদান থেকে জটিল কোষীয় জীবনের বিকাশ ঘটতে খুব বেশি ভূতাত্ত্বিক সময়ের প্রয়োজন হয়নি। তাছাড়া পৃথিবীতে জীবন একবার উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে গেলে দ্রুত বিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়। ফলে অন্য গ্রহ বা উপগ্রহে অনুকূল পরিবেশ থাকলে সেখানেও জীবনের সম্ভাবনা আগের তুলনায় বেশি। জীবনের অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা ও অভিযোজন ক্ষমতার আরেকটি প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে গবেষণাটি।
সূত্র: Nature Ecology & Evolution ; June ; 2026
